হেফাজতের মঞ্চে ছিলেন মাওলানা জুনায়েদ; শাপলা অভিযান সম্পর্কে তার ভাষ্য
16 June 2013, Sunday
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার শাপলা চত্বরে গত ৫ মে মধ্যরাতে হেফাজতে ইসলামের অবস্থান কর্মসূচিতে যৌথবাহিনী অভিযান চালায়। অভিযানের পর নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। হতাহত নিয়ে সবাই যার যার মতো করে বিশ্বাস করার চেষ্টা করেছেন। কেউ বলেছেন- হতাহত হয়েছে কত কেউ তা জানে না। এর মধ্যে ঘটনার শিকার হেফাজত এক বিবৃতিতে বলেছে- ওই রাতে তাদের আড়াই থেকে তিন হাজার নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন আর আহত অজ্ঞাত সংখ্যক। কিন্তু সেই রাতে শাপলা চত্বরে আসলে কি ঘটেছিল তা আজ পর্যন্ত রহস্যই থেকে গেছে। ঘটনার পর মাওলানা জুনায়েদ প্রাথমিকভাবে নিখোঁজ ছিলেন বলে খবর বের হয়। পরে তিনি লন্ডন রয়েছেন বলে আমরা জানতে পারি। এ পর্যায়ে রেডিও তেহরানের পক্ষ থেকে আমরা তার সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা চেষ্টা করেছি সেই রাতের ঘটনার একটা চিত্র উদ্ধার করতে। মাওলানা জুনায়েদ আল-হাবিবও খোলামেলা কথা বলেছেন রেডিও তেহরানের সঙ্গে। বিস্তারিত সাক্ষাতকার পাঠকদের জন্য তুলে ধলা হলো। আশা করছি- পাঠকদের অনেক কৌতুহলের জবাব মিলবে।
ডিও তেহরান: জনাব মাওলানা জুনায়েদ আল-হাবিব আপনি কখন এবং কেন ব্রিটেন গেলেন- এ সম্পর্কে আমাদেরকে কিছু বলেন।
জুনায়েদ আল হাবিব: এই সময়টা আমার ইউরোপ বিশেষ করে ইংল্যান্ড সফরের জন্য নির্ধারিত। সাধারণত প্রতিবছর মে-জুনে ইংল্যান্ডে থাকি। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় আমার প্রোগ্রাম থাকে। বিভিন্ন মাহফিলে আমি ওয়াজ করি। আমার ইংল্যান্ড আসার এটি প্রথম কারণ। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে- গত ৫ মে মধ্যরাতে হেফাজতে ইসলামের অবস্থান কর্মসূচিতে যৌথ বাহিনীর অভিযানের ঘটনার পর ৬ ও ৭ তারিখ আমি বাংলাদেশেই ছিলাম। সামগ্রিক পরিস্থিতির বিবেচনায় দেখলাম যে দেশে থাকলেও আমাকে আত্মগোপন করে থাকতে হবে। তাছাড়া, দেরি করে ফেললে দেশ থেকে বের না হতে দেয়ার শঙ্কাও ছিল। ফলে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম দেশ থেকে চলে যাই।
ইংল্যান্ডে এসে বিভিন্ন জায়গায় আমার পূর্ব নির্ধারিত মাহফিলে ওয়াজ করছি। একই সাথে দেশের সার্বিক বিষয়ে খোঁজ-খবর রাখতে পারছি।
রেডিও তেহরান: ৬ মে রাতে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে হামলার সময় আপনি কোথায় ছিলেন এবং ওই রাতে যৌথবাহিনী যে অভিযান চালিয়েছে সে সম্পর্কে আপনি কি জানেন?
জুনায়েদ আল হাবিব: ৬ মে রাতে হেফাজতে ইসলামের অবস্থান কর্মসূচিতে আমি ছিলাম। আর ওই রাতের হামলা সম্পর্কে আমি আর কী বলব? সেই রাতের ঘটনা বিশ্বের মিডিয়াগুলোতে প্রচার হয়েছে। তবে আমরা যারা ওখানে সরেজমিনে ছিলাম, আমরা যা দেখেছি তা হচ্ছে- চতুর্দিক থেকে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীদের ওপর রাতের অন্ধকারে লাইট নিভিয়ে দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। হেফাজতের ওপর ওই রাতের হামলা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তান বাহিনীর হামলাকেও হার মানিয়েছে। এ সম্পর্কে অনেকে এমনও মন্তব্য করেছেন যে, ইসলামের ইতিহাসে বাংলাদেশে এটা ছিল দ্বিতীয় কারবালা। বাংলাদেশের সুনাগরিক, যারা তাদের জীবনে কোনো সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত না। আমাদের দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাসে কোথাও কোনো ভাঙচুর, অগ্নিকাণ্ড বা আক্রমণাত্মক কোনো কর্মকাণ্ডের ঘটনা নেই। আমাদের আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণ অহিংস। সেই সুনাগরিকরা তাদের নিজের দেশে যখন একটি অহিংস আন্দোলনের অংশ হিসেবে শাপলা চত্বরে অবস্থান নিল এবং ওই রাতে যখন কেউ তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ছিল, কেউ জিকির করছিল আবার কেউ ক্লান্ত-শ্রান্তহয়ে ঘুমচ্ছিল তখন তাদের ওপর বর্বর আক্রমণের বিষয়টি সারা বিশ্ব দেখেছে। ফলে এ বিষয়ে আর আমি আপনাদের কি বলব!
রেডিও তেহরান: ওই রাতে হামলায় হতাহত নিয়ে নানা ধরনের কথা শোনা যাচ্ছে। তবে, সরকার দাবি করেছে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। আপনি হেফাজতের একজন কেন্দ্রীয় নেতা এবং ওই দিন আপনার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে আপনার অনেক কিছু জানার কথা এবং আপনি মঞ্চে ছিলেন। এ বিষয়ে অর্থাত ওই রাতের অভিযান এবং হতাহতের ঘটনা সম্পর্কে কি আপনি একটু বিস্তারিত বলবেন?
জুনায়েদ আল হাবিব: দেখুন, ওই রাতে হেফাজতে ইসলামের ওপর যে সরকারের যৌথবাহিনী অভিযান চালিয়েছে তা ছিল সম্পূর্ণ অন্যায়। আমাদের ওপর তারা বর্বর আচরণ করেছে। সারা দুনিয়া দেখেছে সে চিত্র। এমন ঘটনা ঘটবে এমন ধারণা আমাদের কারও ছিল না এবং গোটা বিশ্বের কেউ এমন ধারণ করেনি। যৌথ বাহিনী অভিযান চালানোর আগে আমাদেরকে বলেছে আপনারা এখান থেকে উঠে যান। কিন্তু এত রাতে এতগুলো মানুষ আমরা যাবো কোথায়? আমরা তখন বলেছি যে, আমাদের আমির আল্লামা আহমদ শফী সাহেব ফজরের নামাজের পর এখানে আসবেন। আল্লামা বাবুনগরী সাহেব ঘোষণাও দিয়েছিলেন যে, আল্লামা আহমদ শফী সাহেব ফজরের পর এখানে এসে পরবর্তী নির্দেশ দেবেন। আমরা এখন রাতে এখানে অবস্থান করব। কিন্তু, আমাদেরকে এতটুকু সুযোগ দেয়া হয়নি। অন্যদিকে, আমরা দেখলাম শাহবাগে তিনমাস পর্যন্ত গণজাগরণ মঞ্চের অল্প সংখ্যক কিছু লোককে পুলিশ পাহারা ও সবরকমের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে লালন-পালণ করা হলো, সমাজগর্হিত যত ধরনের কাজ আছে তাদেরকে তা করার সুযোগ দেয়া হলো। এই হলো সরকারের অবস্থা।
দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, এখানে হতাহতের বিষয় নিয়ে নানা ধরনের কথা শোনা যাচ্ছে এবং সরকার দাবি করেছে সেখানে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। সরকারের এ দাবি সত্য নয়। একথাও ঠিক যে ওই রাতে হতাহতের পরিসংখ্যন আসলে কত তা আমিও পুরোপুরি জানতে পারিনি। তার কারণ হচ্ছে- সরকারি ধরপাকড় এবং জুলুম অত্যাচারের কারণে কেউ নিহত হলেও, কোনো পরিবারের সন্তান, ভাই-ব্রাদার বা অন্য কোনো সদস্য নিহত-আহত বা নিখোঁজ হলেও তারা এটা প্রকাশ করতে রাজি না। তারা সবাই মারাত্মক ভয়-ভীতির মধ্যে আছে। এমনকি বিভিন্ন জায়গায় যারা নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে বা যে পরিবারের কেউ নিখোঁজ হয়েছেন তাদেরকে বার বার হুমকি দেয়া হচ্ছে -এমন খবরও আমাদের কাছে আছে। তাদেরকে এভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে যে- নিহত, আহত বা নিখোঁজ হওয়ার খবর যেন কেউ প্রকাশ না করে। আর যদি কেউ এসব তথ্য প্রকাশ করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হবে, গ্রেফতার করে রিমাণ্ডে নেয়া হবে, নানাভাবে হয়রানি করা হবে। হেফাজতের মিটিং বা সমাবেশে তারা গিয়েছিল এরকম তথ্য যেন কেউ প্রকাশ না করে বলে তারা কঠোরভাবে হুমকি দিচ্ছে। আর এ কারণে আসলে ওই রাতে হতাহতের পরিমাণ কত তার সঠিক পরিসংখ্যান দিতে পারছি না। তবে এটুকু বলব- হতাহতের পরিমাণ অনেক। কারণ যে ধরনের আক্রমণ বা হামলা চালানো হয়েছে চতুর্দিক থেকে, বুলডোজার চালানো হয়েছে মানুষের ওপর, ভয়াবহ তাণ্ডব চালানো হয়েছে চারদিকে থেকে বিদ্যুত বন্ধ করে দিয়ে, মিডিয়া বন্ধ করে দিয়ে। ফলে হতাহতের পরিমাণ যে অনেক তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
রেডিও তেহরান: আচ্ছা ওই রাতের অভিযান কিভাবে শুরু হলো এবং কত সময় ধরে চলেছিল?
জুনায়েদ আল হাবিব: রাত যখন আস্তে আস্তে গভীর হওয়া শুরু করলো তখন যৌথ বাহিনী অভিযান শুরু করেছিল এবং ভোর পর্যন্ত নৃশংস অভিযান চলে। আমরা প্রথমে চারদিক থেকে নানা রকম গুলির শব্দ শুনতে পাই। এ প্রসঙ্গে একটু বলে রাখব- দিনের বেলায় যখন আমাদের নেতা-কর্মীরা ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিতে আসেন তখন থেকেই ঢাকার বিভিন্ন স্পটে আমাদের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা শুরু করে সরকার দলীয় লোকেরা। বায়তুল মোকাররম, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এবং গুলিস্তানসহ বিভিন্ন জায়গায় সরকারি দলের লোকদের হাতে আমাদের বেশ কয়েক নেতাকর্মী নিহত হন। তারপরও আমরা উত্তেজিত হইনি। ফলে সেই সময় থেকে শুরু হয়ে গুলিসহ নানা ধরনের আওয়াজ হচ্ছিল। তবে মূলত তারা হামলা শুরু করে রাত আড়াইটার সময় এবং তখন থেকে ভোর রাত পর্যন্ত তাদের আক্রমণ চলে।
রেডিও তেহরান: হেফাজতের মহাসমাবেশে হামলার পর অনেকেই বলছেন, এ সংগঠনটি শেষ হয়ে গেছে। এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি? হেফাজত কি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?
জুনায়েদ আল হাবিব: ওই ঘটনার পর অনেকে বলছেন হেফাজতে ইসলাম গর্তে চলে গেছে। তাছাড়া আপনি যেমনটি প্রশ্ন করলেন হেফাজত শেষ হয়ে গেছে। হেফাজত আর দাঁড়াতে পারবে না। এসব কথা সম্পূর্ণ ভুল এবং অর্থহীন। হেফাজতে ইসলামী অতীতে যেমন শক্ত অবস্থানে ছিল এখনও সেই একইরকম শক্ত অবস্থানে আছে। এত নেতা-কর্মী হতাহতের পরও হেফাজতের মনোবল সবদিক থেকে একইরকম চাঙ্গা আছে। বিশেষ করে আমাদের আমির মাওলানা আহমদ শফী উনি সবদিক থেকে যথার্থ নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন এবং উনার মনোবল খুবই শক্ত, খুবই চাঙ্গা। তবে এ মুহুর্তে মাঠ পর্যায়ে আমাদের কোনো কর্মসূচি নেই। এর একটা বাস্তবতা হলো- বাংলাদেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশের সরকারি দল বা বিরোধীদল মাঠ পর্যায়ে কোনো কর্মসূচি দিতে গেলে তারা বলে অমুক পরীক্ষা তমুক পরীক্ষার জন্য আপাতত কর্মসূচি দেয়া যাচ্ছে না। এসব খবর মিডিয়াতে প্রায়ই আসে। তো আমি যেকথা বলছিলাম গোটা বাংলাদেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে জড়িত। কওমি মাদ্রাসায় এখন বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। এই পরীক্ষার কারণে আমরা এ মুহুর্তে কোনো কর্মসূচি দিতে পারছি না। তাছাড়া, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির দিকে আমরা দৃষ্টি রাখছি। পরীক্ষার পর পরই আমরা কর্মসূচি দেব একথা আমাদের আমির মাওলানা আল্লামা আহমদ শফী সাহেব বলেছেন। আমরা তখন আবার ময়দানে নামব। তবে আমাদের সাংগঠনিক কাজকর্ম বন্ধ নেই। সারাদেশে আমাদের নেটওয়ার্ক সক্রিয়, সর্বত্র আমাদের ততপরতা অব্যহত আছে।
রেডিও তেহরান: ৫ মে'র কর্মসূচিতে কোনো ভুল ছিল বলে আপনারা মনে করছেন? যদি থাকে তাহলে তা কি এবং কিভাবে তা সংশোধন করতে চান?
জুনায়েদ আল হাবিব: না, কোনো ভুল ছিল বলে আমরা মনে করি না। আমাদের পদক্ষেপে কোনো ভুল নেই। আমাদেরকে নিয়ে অনেকে অনেক রকম রটনা রটাচ্ছে যে, আমরা জামায়াতের দ্বারা, বিএনপির দ্বারা প্রভাবিত। বিএনপি বা জামায়াতের সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না বা তাদের কোনো নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আমাদের কোনো আলোচনা হয়নি। ব্যক্তিকেন্দ্রিক কারো সঙ্গে কোনো যোগাযোগ বা আলোচনা হয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই। ফলে এ ধরনের কোনো বিষয় থাকলে তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হলে হতে পারে সেটা ভিন্ন জিনিষ। তবে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই- হেফাজতে ইসলামের আমরা যারা নীতি নির্ধারক ছিলাম তাদের সঙ্গে বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামের কোনো সম্পর্ক বা বোঝাপড়া নেই। তাছাড়া তারা আমাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে এ ধরনের কোনো বিষয় আমি দেখিনি। কাউকে ক্ষমাতচ্যুত করা বা কাউকে ক্ষমতায় বসানো এরকম কোনো উদ্দেশ্য আমাদের ছিল না। আমাদের আন্দোলন ছিল ১৩ দফা দাবি নিয়ে। আমাদের সেই ১৩ দফা দাবি আদায় করাই ছিল আমাদের উদ্দেশ্য। দাবি আদায়ের জন্য কেউ হরতাল করে, কেউ অবরোধ করে-আমরাও সেটা করেছি। আর আমাদের সেই দাবি আদায়ের জন্য ওই রাতে আমরা শাপলা চত্বরে অবস্থান করেছিলাম। ফলে এখানে আমাদের ভুলের তো কোনো প্রশ্ন ওঠে না, সেটা ছিল আমাদের কর্মসূচি।
রেডিও তেহরান: মাওলানা জুনায়েদ আল-হাবিব, এত বিশাল কর্মসূচির জন্য আপনাদের কি সঠিক ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা ছিল? অর্থাত সরকারের পক্ষ থেকে বাধা এলে আপনারা কি করবেন এবং লোকজনের যদি রাতে থাকার প্রয়োজন হতো তাহলে আপনাদের লাখ লাখ কর্মী কি করবেন, কোথায় থাকবেন সে বিষয়ে আপনাদের কোনো পরিকল্পনা ও নির্দেশনা ছিল?
জুনায়েদ আল হাবিব: দেখুন আমাদের যে পরিকল্পনা ছিল সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা কাজ করেছি, আমরা অবরোধ ও সমাবেশ করেছি। তবে রাতে অবস্থানের কোনো পরিকল্পনা আমাদের আগে থেকে ছিল না কিন্তু আমরা বিভিন্ন কারণে বাধ্য হয়েছি সেখানে রাতে অবস্থান করতে। কারণ হচ্ছে- দিনের বেলায় যখন আমাদের নেতা-কর্মীদের ওপর বিভিন্ন জায়গায় সরকারি দলের লোকেরা আক্রমণ করে এবং অব্যাহতভাবে সেই আক্রমণ চলতে থাকে এবং এভাবে সন্ধ্যা হয়ে যায়তখন আমাদের রাতে অবস্থান করা ছাড়া উপায় ছিল না। আমাদের বহুসংখ্যক কর্মী আছে যারা কখনও ঢাকায় আসেনি, এখানকার রাস্তাঘাট কিছুই চেনে না। তার ওপর সরকারি বাহিনীর হামলা। ফলে এই ধরনের আক্রমণাত্মক অবস্থার মধ্যে আমরা আমাদের কর্মীদের কোথায় ছেড়ে দেব? তাছাড়া আমাদের আমির এসে আমাদের নির্দেশ দেবেন। আমরা আমিরের হুকুমে বিশ্বাস করি এবং আমাদের আকীদা আমিরের হুকুম মানা ওয়াজিব। আমাদের আন্দোলনের যাবতীয় কিছু, সমস্ত কর্মসূচি উনার হাতেই ন্যস্ত। উনি এখানে আসবেন এবং আখেরি মুনাজাত করবেন এবং আমাদেরকে বিদায় জানাবেন। কিন্তু আমাদের আমিরকে আসতে দেয়া হয়নি। উনি আসছেন, রওয়ানা হয়েছেন এভাবে নানা ঘোষণা আসে। আমরা উনার আসার অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু ওখানে আসতে বাধা দেয়া হলো, উনাকে আসতে দেয়া হলো না। এভাবে মাগরিব ছাড়িয়ে গেল। উনাকে পথ থেকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। এদিকে আমরা আটকে পড়লাম। পরবর্তীতে জুনায়েদ বাবুনগরী সাহেব এসে উনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে বললেন, “আমির মাওলানা আহমদ শফি সাহেবকে আসতে দেয়া হয়নি, উনাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া এখন মাগরিবের ওয়াক্ত হয়ে গেছে এই সময় উনার আসাটাও ঠিক হবে না। আর রাতের বেলা আপনারা কোথায় যাবেন। আপনারা এখানে অবস্থান করেন। সকাল ৬ টার পর হুজুর আসবেন।” এই ঘোষণা সমাবেশ থেকে বলা হয়েছে। ফলে আমাদের এখানে অবস্থান করার কোনো ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও আমরা পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়েছি সেখানে অবস্থান করতে।
তাছাড়া, আমরা এ দেশের নাগরিক, আমরা আন্দোলন করছি আমাদের ১৩ দফা দাবি আদায়ের জন্য। আমরা এখানে অবস্থান করব। আমাদের দাবি ১৩ দফা, আমাদের অন্য কোনো মকসুদ নেই। কারো সঙ্গে আমাদের কোনো রকমের সমঝোতা নেই বা বোঝাপড়া নেই। আমরা কারো দ্বারা প্রভাবিত নই। আমরা রাতের বেলা সেখানে থাকলেই আমাদের ওপর বর্বরোচিতভাবে আক্রমণ চালাবে! এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বে! সরকার এভাবে হামলা চালাবে এমন ধারণা আমাদের ছিল না। ফলে আমরা প্রস্তুতি কি নেব। চর্তুদিকে আমাদের ভলেনটিয়াররা ছিলেন। আমাদের কর্মীরা নামাজ পড়বে, জিকির করবে তারা রাতটুকু এখানে থাকবে- এই ছিল আমাদের উদ্দেশ্য। আমরা তো কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে যায়নি যে যুদ্ধের প্রস্তুতি মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হবে। আমাদের আমিরের ঘোষণা ছিল তসবিহ আর জায়নামাজ।
রেডিও তেহরান: সবশেষে আমরা জানতে চাইব- আপনাদের নতুন করে কোনো কর্মপরিকল্পনা আছে কি? থাকলে তা কি?
জুনায়েদ আল হাবিব: আমাদের আমির মাওলানা আহমদ শফী তিনি নতুন পরিকল্পনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন এবং চিন্তাভাবনা করছেন। সারাদেশের নেতা-কর্মীরা উনার সঙ্গে দেখা সাক্ষাত করছেন এবং আলোচনা করছেন। ফলে এ ব্যাপারে এ মুহুর্তে আমি কিছু বলব না।
সূত্র : রেডিও তেহরান, ১১ জুন ২০১৩