হজরত যুলকিফল (আ.) আল্লাহর একজন মনোনীত নবী ছিলেন। ইমাম রাজি তার নবী হওয়ার পক্ষে তিনটি প্রমাণ তুলে ধরেছেন। কোরআন শরিফে যে ২৫ জন নবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে তিনি তার একজন। কোরআন শরিফে দুই জায়গায় তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আম্বিয়ায় আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, (স্মরণ করো) ইসমাঈল, ইদ্রিস এবং যুলকিফলকে। তারা সবাই ধৈর্যশীল। আর আমি তাদের আমার রহমতের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছি। তারা আমার নেক বান্দাদের অন্তর্গত। (সূরা আম্বিয়া : ৮৫-৮৭)। এছাড়া সূরা সাদের ৪৮নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর স্মরণ করো ইসমাঈল, আলইয়াসা এবং যুলকিফলকে। তারা সবাই আমার উত্তম বান্দার অন্তর্গত। (আল কোরআন)।
তাকে এ নামে নামকরণের সার্থকতা তার জীবনের অনেক ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত হয়। তাফসিরে কুরতুবিতে মুহাম্মাদ বিন কায়েস থেকে একটি বর্ণনা উল্লেখ করা হয় যে, বনি ইসরাইলের মধ্যে একজন নেককার বাদশাহ ছিল। মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তিনি তার করমকে একত্রিত করে বললেন, কে আমার রাজত্বভার গ্রহণ করতে রাজি আছ? আমি তাকে আমার সব দায়িত্বভার অর্পণ করব। তবে শর্ত হলো, তাকে দিনে রোজা রাখতে হবে, রাতে ইবাদত করতে হবে, আল্লাহর নির্দেশমতো বিচার ফয়সালা করতে হবে এবং কখনও সে রাগ হতে পারবে না। তখন এক যুবক দাঁড়াল। কম বয়স দেখে বাদশাহর পছন্দ হলো না। তাই তিনি আবার ঘোষণা দিলেন। ওই যুবক ছাড়া আর কেউ দাঁড়াল না। বাদশাহ আবারও ঘোষণা দিলেন। এবারও ওই যুবকই দাঁড়ালেন। অবশেষে বাদশাহ তাকে কাছে ডেকে পুরো রাজ্যের দায়িত্বভার বুঝিয়ে দিলেন। এরপর দীর্ঘদিন ওই যুবক বনি ইসরাইলের বাদশাহি করলেন। এ যুবকই হলেন হজরত যুলকিফল (আ.)। বাদশাহি দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন বিধায় তাকে যুলকিফল বা দায়িত্ব গ্রহণকারী উপাধি দেয়া হয়। (তাফসিরে কুরতুবি)।
তাফসিরে কুরতুবিতে হজরত কাব থেকে আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করা হয় যে, বনি ইসরাইলের মধ্যে এক কাফের বাদশাহ ছিল। একজন নেককার ব্যক্তি তার কাছে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে গেল। বাদশাহ বলল, আমি ইমান আনলে কী পাব? নেককার লোকটি বলল, জান্নাত পাবে। বাদশাহ বলল, আমার জান্নাতের জিম্মাদার কে হবে? লোকটি বলল, আমি হব। তার কথায় বাদশাহ ইমান আনল এবং এর কিছুদিন পর মারা গেল। তাকে দাফন করা হলো। পরদিন দেখা গেল তার একটি হাত কবরের বাইরে বেরিয়ে আছে এবং তাতে সবুজ একটি চিরকুট। লোকজন গিয়ে দেখল চিরকুটে নূরের অক্ষরে লেখা রয়েছে, 'আমাকে আল্লাহ তায়ালা মাফ করেছেন এবং অমুকের জিম্মাদারিতে আমাকে আল্লাহ জান্নাত দান করেছেন। (কুরতুবি)।' তারিখু মদিনাতি দিমাশক কিতাবে ঘটনা আরও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং বাদশাহর নাম কেনান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, এ ঘটনা দেখে ১ লাখ ২৪ হাজার লোক ঈমান গ্রহণ করেছিল। ওই নেককার ব্যক্তি তাদের ব্যাপারেও জান্নাতের জিম্মাদারি গ্রহণ করেছিলেন। এজন্যই তাকে জিম্মা গ্রহণকারী তথা যুলকিফল বলা হয়। ইনিই আল্লাহর নবী হজরত যুলকিফল (আ.)। তার যুলকিফল নামকরণের আর একটা কারণ বলা হয় যে, আল্লাহ তার ইবাদতের ব্যাপারে তার সমসাময়িক অন্য নবীদের চেয়ে দ্বিগুণ সওয়াব দেয়ার ওয়াদা করেছিলেন, এজন্য তাকে যুলকিফল বলা হয়। যেহেতু যুলকিফলের এক অর্থ দ্বিগুণের অধিকারী (কুরতুবি)।
তার প্রকৃত পরিচয় নিয়ে রয়েছে বিস্তর মতভেদ। আধুনিক গবেষকদের মতে, ইহুদিরা যাকে হিজকিল নবী বলে থাকে তিনিই হজরত যুলকিফল (আ.)। মুসলিম প-িতদের অনেকের মতে, তার প্রকৃত নাম বিশর এবং তিনি হজরত আইউব (আ.) এর সন্তান ছিলেন। বলা হয়, হজরত আইউব (আ.) এর পরে তিনি দামেস্ক ও পাশের অঞ্চলে নবী হিসেবে প্রেরিত হন।
তার কবর কোথায় অবস্থিত সে সম্পর্কে রয়েছে একাধিক মত। ১. কারও মতে, দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানে তার মাজার অবস্থিত ২. কারও মতে, সিরিয়ায় ৩. কারও মতে, ইরানে ৪. কারও মতে, ফিলিস্তিনে।
আসলে কোরআন শরিফে যে উদ্দেশ্যে নবীদের উল্লেখ করা হয়েছে তার সঙ্গে এ মতভেদপূর্ণ বিষয়গুলোর সংশ্লিষ্টতা নেই। কোরআন শরিফ নবীদের উত্তম আদর্শের উল্লেখ করে তার প্রতি মানুষকে উদ্বুুদ্ধ করতে চায়। কোরআন হজরত যুলকিফল (আ.) কে যে গুণাবলিতে বিশেষিত করেছে তার জীবনচরিত থেকে সেই সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলির আলোচনাকেই আমাদের প্রাধান্য দিতে হবে। আল্লাহ আমাদের আম্বিয়া কেরামদের আদর্শে আদর্শবান হওয়ার তৌফিক দিন। আমিন।