বিশুদ্ধ ভালবাসা (একটি Scientific ছোট গল্প)
(কাহিনী:কল্পিত, বিষয়বস্তু: Water and sound Pollution ও ইংল্যান্ডের টুকিটাকি)
পাশাপাশি দুজন একই রুমে বসি, আমি ও ক্যাটরিনা | দুজনেই পিএইচডি করছি ইংল্যান্ডের নিউক্যাসেল আপন টাইন বিশ্ববিদ্যালয়ে | আমাদের দুজনের সুপারভাইজার Water Resource ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর কালাহান | ক্যাটরিনার গবেষণার বিষয় ‘Sound Pollution’, আর আমার বিষয় ‘Clean Water in Bangladesh’ | প্রফেসর কালাহানের বয়স প্রায় সত্তর | পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসরদের বয়সের সীমা থাকেনা, সীমা থাকে গবেষণার | এখানে যার যত গবেষণা সে তত Young; গবেষণা না থাকলে ইয়ংরাই ছাটাই হচ্ছে, আর গবেষণা থাকলে বুড়োরা আজীবন শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন | মাটির গভীরে জল আছে, খানা-খন্দক আছে, খাল-বিল-হাওর আছে, নদী আছে, সাগর আছে যেমনি আছে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে | মহাশুন্যেও এমন একটি নক্ষত্র আছে যেখানে আছে পৃথিবীর সমুদয় জলের চল্লিশ হাজার গুণ | এই যে এত জল, তারপরও মানুষের বিশুদ্ধ জলের অভাব আছে, পানীয় জলের অভাব আছে | প্রফেসর কালাহান জল খুঁজে বেড়াচ্ছেন, মানুষের পিপাসা নিবারনার্থে বিশুদ্ধ জলের সন্ধান করে যাচ্ছেন | নেটে ঘেঁটে ঘেঁটে প্রফেসর কালাহানের সন্ধান পেয়ে তার তত্ত্বাবধানে PhD করার লক্ষ্যে আবেদন করলে তিনি অত্যন্ত প্রীত হয়ে আমাকে সম্মতি প্রদান করেন | কারণ ইতিপূর্বে তার অধীনে বাংলাদেশি ছাত্ররা সুনামের সাথে গবেষণা করেছেন ; অধিকন্তু বাংলাদেশে বিশুদ্ধ জলের সন্ধানে অবদান রেখে নিজে গৌরবাম্বিত হতে পারবেন |
বুয়েটের Water Resource ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে এম, এস ডিগ্রী নিয়ে ঢাকা ওয়াসার ‘ক্লিন ওয়াটার’ প্রকল্পে গবেষণা কর্মকর্তা পদে চাকরি পেয়ে গবেষণার ব্রত নিয়ে জীবন কাটিয়ে নেয়ার মানসিকতা আমার গড়ে উঠেছে | মিরপুর ১০ নম্বরের সন্নিকটেই ওয়াসার অফিসই আমার কর্মস্থল | এই একবিংশ শতাব্দীতে নদী মাতৃক এ ছোট্ট বাংলাদেশে ১৬ কোটি মানুষের খানাপিনা ও অন্যান্য ব্যবহারের লক্ষ্যে পরিষ্কার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ সরকার ও পানি-বিজ্ঞানিদের নিকট এক হুমকী হিসাবে দেখা দিয়েছে | বিভিন্ন পর্যায়ে Seminar-Symposium এ এবিষয়ে গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের তথ্য তুলে ধরা হচ্ছে এবং ভবিষ্যত কর্মপন্থা অবলম্বনে নীতি নির্ধারণ পর্যায়ে গভীর মনোযোগের সাথে বিশ্লেষণ পূর্বক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে | এরই পরিপ্রেক্ষিতে কর্মরত গবেষকদের বিদেশে গবেষণার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে, তেমনি British Council এর একটি বৃত্তির সুবাদে আমি যুক্তরাজ্যে গবেষণার সুযোগ লাভ করেছি |
নিউক্যাসেল আপন টাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ডর্মেটরীতে আমি থাকছি | ডর্মেটরীর রুমগুলো পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম আবাসস্থলের অন্যতম, এবং খাটগুলিও অনুরূপ | আমার মত আরও পাঁচ জন এখানে বাস করে যাদের জাতীয়তা ভিন্ন ভিন্ন | সবার জন্য Common কিচেন ও ডাইনিং | নিজে পাক করে খেতে হয়, নিজেকেই বাজার করতে হয় | নিউক্যাসেলে অনেক বাঙালি পরিবার বাস করে থাকে | এখানে পড়তে আসা বাংলাদেশি ছাত্রদের সাথে অনেকের সখ্যতা গড়ে উঠে | তারা একই সাথে বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন করে থাকে, একটা মিনি বাংলাদেশ গড়ে তুলে |
আজ রবিবার | শীত বাড়ছে, শুণ্যের কাছাকাছি তাপমাত্রা | ঠাণ্ডা বাতাস বইছে | আমি ডাবল মোজা পরেছি , থারমাল পরেছি, ওভার কোট গায়ে দিয়ে মাপ্লারের ওপর দিয়ে জড়িয়ে নিয়েছি যাতে শীত তার ধারে কাছে না আসে | রাস্তা ধরে একা একাই হেঁটে চলছি, ওধারে একটি পার্ক দেখা যাচ্ছে; আমি এর ভেতর ঢুকে গেলাম | পার্কের এদিক ওদিক নানা জাতের ফুল | আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে ফুলের সৌন্দর্য দেখে দেখে চলতে লাগলাম | এক প্রান্তে একটি বেঞ্চি, কিছুক্ষণ সেথায় বসে রইলাম | চারিদিকে গাছপালা, পাতা ঝরে গেছে; যেন মরে গেছে | ন্যাংটো ন্যাংটো লাগছে | একটি কাঠ বিড়ালি আমার নজরে এলো | এটি আমার দিকে বার বার তাকাচ্ছে | আমাকে হয়তো অচেনা লাগছে | কাঠ বিড়ালিটি একেবারে আমার কাছে এসে গেছে; বেশ সুন্দর লাগছে | এটি ধরার জন্য এগিয়ে গেলাম | পালিয়ে গেল, আমি তার পিছু পিছু ছুটছি, | অনেক দূর এগিয়ে এসেছি | কাঠ বিড়ালিটি হারিয়ে গেল, সেই সাথে আমি পথ হারিয়ে ফেললাম | আমি পার্কের শেষ প্রান্তে | এক British মেয়ে আমার পাশ দিয়ে চলে গেল, আমি তাকিয়ে দেখলাম; উঁচু-লম্বা, বাদামী-ফর্সা | আরও একটি মেয়ে এমনি করে হেঁটে গেল | এদেরকে আমার ছোট বেলার গল্পের সেই পরীর মত মনে হল | আমার রাক্ষস-খোক্কসের কথা মনে পড়ল | আমি সেদিকে এগিয়ে গেলাম | ঐ দূরে একটি বিশাল ঘর | এ ঘরেই কি রাক্ষস বাস করে ? আমি সে ঘরের দিকে গেলাম | ঘরের ভিতর একটি পুকুর | গল্পে পুকুরের জলে একটি কৌটা লুকোনো থাকতো, তার ভিতর একটি ভ্রমর ; এবং সেটি বধ করলেই রাক্ষস নিধন | কিন্তু আমি দেখতে পেলাম এ পুকুরের নীল-স্বচ্ছ জলের ভিতর ব্রিটিশ বালক-বালিকা, তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতিরা সাঁতার কাটছে | ওপরে লেখা SWIMMING POOL; রাক্ষস নয়, পানির স্বচ্ছতা দেখে আমি অভিভূত হলাম | হায় ! আমি তো এমন পানির আশায় গবেষণা করার জন্য যুক্তরাজ্যে এসেছি | বাংলাদেশের প্রতিটি নদ-নদী, খালে-বিলে চাই এমন স্বচ্ছ বিশুদ্ধ পানি |
আমার গবেষণাগার porter Building এ, সেই সকালে আসি | রাতে রুমে ফিরি | ল্যাবে পানি Test করি, কম্পিউটারে data analysis করি | পানি একটি যৌগিক পদার্থ | ল্যাবরেটরীতে আট ভাগ অক্সিজেনের সঙ্গে এক ভাগ হাইড্রজেন মিশালে পানি পাওয়া যায়, কিন্তু প্রকৃতির পানি আল্লাহর দান | এটি আকাশে থাকে, বাতাসে থাকে, পাতালে থাকে; খালে বিলে, নদীতে থাকে, সাগর-মহাসাগরে থাকে | প্রাণী বা উদ্ভিদের মাঝে থাকে, এদের জীব-স্পন্দনে প্রতিনিয়ত প্রয়োজন হয় পানি | এর মাঝে থাকে আবার কিছু জৈব–অজৈব পদার্থ; কিছু দ্রবীভূত, কিছু ভাসমান | এদের কিছু ক্ষতিকারক, কিছু উপকারী | ক্ষতিকারক পদার্থ পানিতে থাকলেই তাকে দূষিত বলে | দূষিত পানি পান করলে অসুখ হয় এবং কোনটি মারাত্বক স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ায় | অন্যান্য ব্যবহারেও যেমন গোছল, কৃষি, পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি কাজে বিশুদ্ধ পানি দরকার হয় |
সেদিন BBCর খবরে লক্ষ্য করলাম, যুক্তরাজ্যের পরিবেশ মন্ত্রী খালি গায়ে সাগর তীরের পানিতে ডুব দিচ্ছেন | আমার কৌতূহল বেড়ে গেল, আমি বিষয়টিতে আরও মনোযোগ দিয়ে জানতে পারলাম যে পত্রিকায় সমুদ্র সৈকতের পানির গুণমান স্নানোপযোগী নয় বলে রিপোর্ট বেরিয়েছে | মন্ত্রী মহোদয় সেই পানির মান পরীক্ষা করতে নিজে সেখানে স্নান করে তার আলোকে ব্যবস্থা নেবেন | এখানকার মানুষের যেমন পরিচ্ছন্ন বোধ আছে তেমনি সরকারের আছে দায়িত্ববোধ | বাংলাদেশের মানুষকে সচেতন করতে হবে, পরিষ্কার পানি ব্যবহারে আগ্রহী করে তুলতে হবে তখনই সরকার পরিষ্কার পানি সরবরাহে মনোযোগী হবে আমার ধারণা |
ল্যাবরেটরিতে আমার সময় কাটে | মাঝে মাঝে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াই | Sea-beach যাই, বিশেষ করে ছুটির দিনে | সাগর পারের মনোরম দৃশ্য অবলোকন করি, সাগরের জল দেখি, ঢেউ দেখি | কী স্বচ্ছ নীল! কেহ কেহ জলে নামছে, কেহ বা বালু চরে ঘুরছে | এখান থেকে জল সংগ্রহ করি | ল্যাবে test করি, দেখি সব দূষণমুক্ত | এ সব ফলাফলে মনটা ভাল হয়ে উঠে, দ্বিগুণ উত্সাহে কাজ শুরু করি | ক্লান্তি আসলে ল্যাবে চেয়ারে বসে ঘুমিয়ে যাই, না হয় এদিক ওদিক ঘুরি | রাস্তার ওধারে Hay Market, তারপর Eldon Square. এটি বিশাল মার্কেট | মাঝখানে করিডোর, দু-পাশে দোকান | চাক-চিক্যময় এসব দোকানে নানা বাহারী জিনিসের সমাহার | চোখ ধাঁধানো আলোর ঝলকানি | দোকানী যুবক-যুবতীরা | রঙ ও রূপের অপূর্ব মিশ্রণ এখানে | ঘুরে ঘুরে জিনিস দেখি, মানুষ দেখি | ওরা অনেক ভদ্র, ভদ্রতা দেখি | ‘Excuse me sir, May I help you?’ কথাগুলি শুনতে ভাল লাগে |
Fenham এর দোকানে ঘুরছি | সাজানো-গুছানো প্রতিটি স্টল | ভাবলাম ছবি তুলি, ক্যামেরা বের করে ছবি তোলার উদ্যোগ নিতেই দেখি ক্যাটরিনা ওখানে দাঁড়িয়ে | সে দৌড়ে কাছে এসে বলল ‘Please don’t, it’s prohibited’. এখানে আইন মেনে চলতে হয়, নিয়ম মেনে চলতে হয় | আইন-নিয়ম মেনেই এদের ভদ্রতা গড়ে উঠে | আমার ছবি তোলা হলোনা |
ক্যাটরিনা ও আমি একই রুমে বসি | চেয়ার, টেবিল, কম্পিউটার, বই-পুস্তকে সুসজ্জিত রুম | মোটা কার্পেট বিছানো, সেন্ট্রাল হিটার দেয়া আছে | কিন্তু দু’জনের মুখ দুদিকে ঘুরানো | আলাদা চাবি দিয়ে একই দরজা দিয়ে ঢুকি, আবার সেভাবেই চলে যাই | তার সাথে কদাচিত কথা হয় | অপ্রাসঙ্গিক কথা ওরা বলেনা | Hellow, Hay! গুড মর্নিং ইত্যাদি | তার গবেষণা শব্দের উপর, এ জন্য আমি তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখি যাতে কোন শব্দ না হয় | কারণ সে শব্দ খুঁজে বেড়ায় | তার মাত্রা দেখে | যন্ত্রে মাত্রা decibol এ ধরা পড়ে | নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি হলে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর | মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তার ব্রেইনের জন্য ক্ষতিকর | সেজন্য তা প্রতিরোধ করতে হবে, টেকনোলজি develop করতে হবে | এ লক্ষ্যেই তার গবেষণা |
পানির ও স্বচ্ছতার মাত্রা আছে | খাবার পানিতে এক ধরণের মাত্রা, কৃষিতে আরেক ধরণের মাত্রা | অল্প পানি আমরা হয়তো সহজেই পরিষ্কার করতে পারি কিন্তু বিশাল আকারের পানিকে পরিষ্কার করতে বহু অর্থ ব্যয় করতে হবে | বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠির জন্য প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ পানির যোগানের জন্য চাই নতুন Technology. আমার গবেষণার বিষয় পানিকে বিশুদ্ধ করার নতুন Technology ডেভেলপ করা | পৃথিবীতে নানা উন্নত প্রযুক্তি আছে, আমি সেগুলি review করছি | প্রফেসর কালাহান কিছু নতুন ধ্যান-ধারণা দিচ্ছেন, সেগুলির উপযোগিতা বিশ্লেষণ করছি | কম্পিউটার Model করছি | বাংলাদেশে বিদ্যমান পানি শোধনে Natural এবং Artificial সকল কার্যক্রম পর্যালোচনা করছি | বাংলাদেশে বিলে প্রচুর কচুরিপানা দেখা যায়, এগুলির Phisiology Study করে দেখতে পেয়েছি যে পানি পরিশোধনে এদের যথেষ্ট ভূমিকা আছে | পানিতে বিদ্যমান দ্রবীভূত Impurity সমূহ এ গাছের শিকড় টেনে নেয় এবং পানিকে pure ও শীতল করে তোলে | তবে Heavy Metal শোষণে এর কার্যকারিতা সন্তোষজনক নয় | প্রফেসর কালাহান পরামর্শ দিলেন Artificial কচুরিপানা গাছ সৃষ্টি করা এবং আমার থিসিস টাইটেল হল ‘Artificial water hyacinth for cleaning polluted water in Bangldesh’. আমার কাজ হল Natural ও Artificial দু’ধরণের কচুরিপানার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা |
মাঠ এবং ল্যাবরেটরি দু’জায়গাতেই আমার কাজ চলছে | একটি Mini lake তৈরী করা হয়েছে | সেখানে Impure পানি দেয়া হচ্ছে | Natural ও Artificial কচুরিপানা রেখে কয়েকদিন পরপর সেই পানি পরীক্ষা করা হচ্ছে | পানিতে ধনাত্বক এবং ঋণাত্বক দু-ধরণের Colloid আছে, Artificial কচুরিপানার শেকড় ঋণাত্বক এবং ধনাত্বক এ দু-বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত | ফলে এরা পানি থেকে বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্যের দ্রব্য শোষণ করে এবং পানিকে পরিশোধন করে | প্রতিনিয়ত পানি পরীক্ষা করা হচ্ছে; ফলাফল বিশ্লেষণ করা হচ্ছে | প্রফেসরের সঙ্গে আলোচনা করে Artificial কচুরিপানার Structure পরিবর্তন করছি যাতে দ্রবীভূত Heavy Metal শোষণ করে পানিকে আরও দূষনমুক্ত করা যায় | সকল Data পর্যালোচনা করে প্রফেসর একদিন বললেন ‘তুমি থিসিস লেখা শুরু কর’ |
আমি Thesis লিখছি | দিন-রাত আমার এক হয়ে গিয়েছে | অনেকদিন পর ক্যাটরিনার মুখোমুখি হলাম | ক্যাটরিনা জিগ্যেস করল, তোমার কাজের কি অবস্থা ? আমি বললাম, ‘আগামীকাল আমার Defends’ |
দ্রুত সময় গড়িয়ে যাচ্ছে | ঢাকার ওয়াসা থেকে আমার ডাক আসছে | ইংল্যান্ড ছেড়ে ঢাকা চলে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছি | টিকেট কাটা হয়েছে | আমার রুমের চাবি বুঝিয়ে দিতে হবে | আগামীকালই আমার যাত্রা | Porter চাবি নিতে এসেছে | আমি তার হাতে চাবি বুঝিয়ে দিয়ে ক্যাটরিনার কাছে এগিয়ে গেলাম | একটু রস করেই বললাম :
- I am leaving you as well as England tomorrow.
- Woh! Good, good. I have a request. Take this coupon. You are invited to this bar in the evening.
এই অবেলায় এমন একটি দাওয়াত মিস করা যায় না | সুদীর্ঘ তিন বছর অতি কাছে থেকেও দূরে ছিলাম | কথা বলতে চেয়েও বলা হয়ে উঠেনি, তাকাতে চেয়েও তাকাইনি |
কোর্ট-প্যান্ট-শার্ট-টাই পরে ওভারকোর্ট গায় দিয়ে Eldon Square এর ডাউনে ব্রিটিশ টাইম মেনে কাঁটায় কাঁটায় রাত সাতটায় Casinoতে পৌঁছলাম | ক্যাটরিনাও এসে হাজির, হাই-হিল পড়েছে, সারা পায়ে ব্লু-স গায়ে জ্যাকেট, ঠোঁটে লিপস্টিক, খাড়া খাড়া ভ্রূ, গালে রঙ , অন্য এক ক্যাটরিনা | কাসিনোর ডিম-লাইটে ক্যাটরিনাকে অপরূপ লাগছে | আজ সে যেন রিয়েল পরী | ক্যাটরিনার মত এখানে অনেক ব্রিটিশ তরুণী-যুবতীর আগমন ঘটেছে, যেন পরীর মেলা | তরুণ-যুবারাও জড়ো হয়েছে | Disco গান বাজছে | ক্যাটরিনা disco গানের সাথে শরীর দোলাতে শুরু করেছে | সে ডাকল, Come on. আমি দাঁড়িয়েই রইলাম | অনেকেই নাচছে | ক্যাটরিনা নাচ থামিয়ে আমার কাছে এল | তার হাতে দুটো গ্লাস, একটি গ্লাস আমার দিকে এগিয়ে দিল | আমি বললাম, No, thanks. সে এক গ্লাস বিয়ার নিয়ে পান করতে লাগল | তার শরীর দুলছে | তার শরীর কাঁপছে | তার বিয়ার খাওয়া শেষ হয়েছে | সে নাচছে | সে উদ্ভ্রান্ত হয়ে নাচছে | আমি দেখছি আর দেখছি |
নাচ শেষ | আলো নিভে গেল | আমরা দুজনই বাইরে এসে পড়েছি | তার এক হাত আমার এক হাতে | দুজন পাশাপাশি হাঁটছি, আমরা হলের দিকে যাচ্ছি | কোন কথা নেই, চুপচাপ | হলের গেইটে পৌছে গেছি | সে থমকে দাঁড়াল, আমার হাত তার হাত থেকে বিচ্ছিন্ন | সে বলল, Mr. Hoq, good night. সে পিছন ফিরে হাঁটতে লাগল | রাস্তায় তার হাইহিলের খট খট শব্দ কানে বাজতে লাগল যা ক্রমে ক্ষীণ হলেও অন্তরে তা বিকট হয়ে ধ্বনিত হতে লাগল |
আগামীকাল আমার দেশে ফিরে যেতে হবে | ব্যাগ গোছানো হয়েছে | বিছানায় শুয়ে ঘুমের চেষ্টা করছি | ঘুমের মাঝে কেবল শুনছি ক্যাটরিনার হাইহিলের খট খট শব্দ | দরজায় কে যেন কড়া নাড়ছে | ক্যাটরিনা ফিরে এল কি? আমি উঠে দরজা খুলে দেখি ট্যাক্সি ড্রাইভার | আমি দ্রুত প্রস্তুতি নিয়ে মালপত্রসহ ট্যাক্সি করে স্টেশনে এসে পৌঁছলাম |
দেশে এসে আমি ঢাকা ওয়াসার সেই কাজে যোগদান করলাম | ইতিমধ্যে প্রকল্প থেকে আমার চাকরি সরকারী হিসাবে অধিভূক্ত হয়েছে এবং আমাকে নির্বাহী পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে | আমার জন্য গাড়ি বরাদ্দ করা হয়েছে যাতে প্রতিদিন অফিসে যাওয়া আসা ছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন পানি উত্স সন্ধানে সহজে যাওয়া আসা করতে পারি |
অফিসে যোগদান করার পরই একটি সুখবর পেলাম, সাভার আর মানিকগঞ্জে মাটির নীচে পানির খনি আবিষ্কৃত হয়েছে | বাহ, ‘পানিরও খনি’ আছে | এটি মহান সৃষ্টি কর্তার দান | এ দুটো ভান্ডারের উত্স হচ্ছে হিমালয় পর্বতমালার একটি হিমবাহ | সেখানে প্রায় ৪০ বছর ব্যবহার করার উপযোগী পানি জমা আছে | এ দুটো ভান্ডারের পানি কখনই ফুরোবেনা বলে ধারণা করা হচ্ছে | এটির সংযোগ সরাসরি হিমালয় পর্বতের সঙ্গে, এ পর্বতের বরফ গলে গলে মাটির গহীনে প্রবেশ করে | তারপর সুরঙ পথে এটি Gravity Flowতে সাগরের দিকে ধাবিত হয় | কোনটি সাগর জলে গিয়ে মিশে, কোনটি বাংলাদেশের নদী বা বিলে প্রবাহ সৃষ্টি করে | এদের কোনটি দৃশ্যমান, কোনটি অদৃশ্য | অতি শীঘ্রই এখান থেকে পানি ঢাকার মিরপুর এলাকায় ব্যবহার শুরু হবে | এই জলাধার প্রায় ৬০০ ফিট নীচে, এবং এর বিস্তৃতিও অনেকখানি | এ পানি সম্পূর্ণই খাবার উপযুক্ত হবে, এতে আয়রনের মাত্রা বেশি তাই একে সামান্য পরিশোধন করে আয়রনের মাত্রা কমাতে হবে | এ জন্য একটি প্লান্ট স্থাপন করতে হবে | আমাকে দৈনন্দিন এ পানির গুনগত মান যাচাই করতে হবে | ঢাকা ওয়াসা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মাটির ওপরের উত্স জাত পানির দিকে যাচ্ছে এবং ২০২১ সালের মধ্যে ঢাকার ৭০ ভাগ পানি মাটির ওপরের উত্স থেকে আসবে যা পরিবেশ বান্ধব |
দেরী না করে আমি ই-মেইলে কালাহানকে খবরটি অবহিত করি | সে উত্তরে জানাল ‘ I am coming to Dhaka soon’. এটি একটি সুখের খবর, প্রফেসর কালাহান বাংলাদেশে আসবেন | তাকে এত কাছে পাব, ভাবাই যায় না | বসকে বললাম, তিনি এমডিকে জানালেন | এমডিকে সৌজন্য করে ই-মেইলে কালাহানকে একটি আমন্ত্রণ পত্র পাঠিয়ে দিলেন |
বাংলাদেশি ছাত্ররা প্রফেসর কালাহানের খুবই প্রিয় | গবেষণায় তাদের দক্ষতা তাকে মুগ্ধ করে | তাই তিনি দেরী না করে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দিলেন | ভোর পাঁচটায় বিমান ঢাকা অবতরণ করবে | আমি বিমান বন্দরে যথা সময়ে হাজির হলাম | আমি গেইটে দাঁড়িয়ে | কালাহান বের হয়ে এলেন | একি ! তার পিছনেই ক্যাটরিনা | আমি অভিভূত হলাম | Greetings জানিয়ে যথারীতি হোটেলে | দুদিন আমার ব্যস্ততায় কাটল | তাকে বাংলদেশের বিভিন্ন নদী নালা দেখালাম | বুড়িগঙ্গা, তুরাগ দেখালাম | আরিচায় পদ্মা নদী দেখালাম | চাঁদপুরে মেঘনা নদী দেখালাম | কালাহানের সাথে ক্যাটরিনা ঘুরে বেড়াচ্ছে | চাঁদপুর এসে ক্যাটরিনার মাথা ঘুরে যাচ্ছে | ‘Is it ocean ?’ ‘No, no; It is a river’. ‘O! I see’.
কালাহানকে সাভার নিয়ে যাওয়া হল, মানিকগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হল | রুমে এসে তিনি ম্যাপ দেখলেন | নেটে সারা পৃথিবীটা দেখলেন, হিমালয় পর্বতের অবস্থান দেখলেন | ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য দেখলেন | হিমালয় পর্বতের অতি গভীরে তৈরী হয়েছে একটি নহর, যা দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে সাভার ও মানিকগঞ্জে জলাশয়ে এসে মিশে গেছে | এটি একটি অফুরন্ত জলাশয়, বলতে গেলে এটি ঢাকার জন্য একটি আশির্বাদ | বাংলাদেশের জন্য পানির দুটো Resourceই সমান গুরুত্বপূর্ন: Surface water and Ground water. Surface water এ জৈব যৌগের পরিমাণ বেশি, অম্লত্ব বেশি, এর PH ৭ এর চেয়ে কম; অপর পক্ষে Ground water অজৈব যৌগের পরিমাণ বেশি, ক্ষারকত্ব বেশি, এর PH ৭ এর বেশি | এ দুটোকে এক সাথে মিশাতে হবে যাতে পরস্পর পরস্পরকে প্রশমন করে এবং PH ৭ এর কাছাকাছি হয় | ফলে বিনা খরচে পানি পরিশোধন হয়ে যায় | যাওয়ার আগে তিনি আরও বললেন, ‘I am happy to say about these sources, but worried about Burigonga and Turag. Please do work on these two. I think Katrina may stay here for few more days. She can get enough data on sound pollution here. Indeed Dhaka may be a centre for research on Pollution. Thank you all.’ এই বলে তিনি হাত নেড়ে বিমান বন্দরে ঢুকে গেলেন | ক্যাটরিনা রয়ে গেল তার পি এইচ ডি গবেষণার আরো তথ্য সংগ্রহ করতে |
আমার কাজের ফাঁকে আমি ক্যাটরিনাকে সময় দেই | ঢাকা সিটির বিভিন্ন জায়গা ঘুরি | শব্দ মাপার যন্ত্র দিয়ে শব্দমাত্রা মাপি | বর্তমানে ঢাকায় শব্দদূষণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে এবং গ্রহণযোগ্যতা মাত্রা থেকে তা অনেক বেশি যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ | বাংলাদেশে দিনের বেলা গ্রহণ যোগ্যতা মাত্রা ৫০dB এবং রাতে তা ৪৫dB, তবে এর মাত্রা ১২০dB থেকে ১৩০dB পর্যন্ত উঠা নামা করে | শব্দ দূষণের প্রধান উত্স যন্ত্রপাতি, যানবাহন, নির্মাণ কাজ | সাধারণতঃ ৬০dB হলে মানুষ সাময়িক বধির হয়ে যায় এবং ১০০dB হলে পূর্নাঙ্গ বধির হয়ে যেতে পারে যদি কেহ আধা ঘন্টা কাল তা শ্রবণ করে |. বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা বাংলাদেশের শব্দ দূষণে বেশ উদ্বিগ্ন এবং তা নিরোধে জনসচেনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করার পরামর্শ দিয়ে আসছে |
আমার কাজের প্রতি তার আগ্রহ লক্ষ্য করলাম | একদিন সে আমার প্রকল্প স্থলে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করল | তাকে মানিকগঞ্জ সিংড়ায় নিয়ে গেলাম | অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন পানি | পানি দেখে তার লোভ লেগে গেল | এ পানিতে সে গোছল করবে | বাংলাদেশের আসার পর তার গোছল হয়ে উঠেনি | বাথরুমের পানির মান খারাপ | সে জলাশয়ে নামার আগ্রহ দেখাল, যেন লাফ দেয় | কিন্তু সেটি ছিল শক্ত গ্রিল দ্বারা বেষ্টিত এবং এর ভেতর প্রবেশ একেবারে নিষিদ্ধ | তার চলে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে | আমি বললাম,
- Can I get sound to measure there?
আমরা একটি গাড়ী করে বাড়ি পৌঁছলাম | বাড়িতে হাঁস আছে, কবুতর আছে, মোরগ মুরগি আছে; গরু-বাছুর আছে, ছাগল আছে | ক্যাটরিনা শব্দ শুনলেই তার মাত্রা মেপে নেয়, খাতায় রেকর্ড করে রাখে | পশু-পাখির ডাকের শব্দ-মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন; কোনটা মধুর, কোনটা কর্কশ | সন্ধ্যারাতে শিয়ালের ডাক শুনে সে চমকে উঠে; মাঝরাতে কুরুয়ার ডাকে সে জেগে উঠে | শিশুদের কান্না, মহিলাদের খিল খিল হাসির মাত্রা সবই তার যন্ত্রে ধরে রাখে | তার মন অনেকটা প্রফুল্ল | কিন্তু তার যাওয়ার দিন ঘনিয়ে এসেছে | আগামীকাল রাতে তার ফ্লাইট |
আজ রাতটা বাড়িতেই কাটিয়ে যেতে চাই | ক্যাটরিনাও সেটাই চাচ্ছে | পাশাপাশি দুটি রুমে আমরা দুজন | মাঝখানের দরজা খোলা | ঘুম আসছেনা | ক্যাটরিনার কথাই ভাবছি | মোবাইল টিপছি | একটি মেসেজ পেলাম | কারিনার মেসেজ | আগামীকাল সন্ধ্যায় ঢাকা পৌঁছছি | কারিনার স্মৃতি মনের মাঝে ভেসে উঠল | বুয়েট থেকে এক সাথে গ্রাজুয়েট হয়েছি, ঢাকা ওয়াসাতে একসাথে জয়েন করেছি | তারপর পিএইচডি করতে সে জাপান, আমি নিউক্যাসেল | কাল ক্যাটরিনাকে বিদায় জানাতে হবে, সেই সাথে কারিনাকে জানাতে হবে স্বাগত |
এ সময় আকাশে মেঘের গর্জন শুনতে পেলাম | কাল বোশেখীর ডাক | ঝড় শুরু হয়ে গিয়েছে | বিদ্যুত চমকাচ্ছে | টিনের চাল উড়ে নিয়ে যাবার অবস্থা | প্রচন্ড বৃষ্টি পড়ছে | ক্যাটরিনা আমায় ডাকছে, হক, হক | আমি উঠে সে কক্ষে গেলাম | ক্যাটরিনা ভয় পেয়েছে |
-Yes, it is raining cats and dogs.
ঝড় থেমেছে কিন্তু বৃষ্টি তখনও পড়ছে | টিনের চাল থেকে বিভিন্ন নালা দিয়ে জল পড়ছে | ক্যাটরিনা বাইরে এসে হতবাক | সে এক চোল পানি হাতে নিল, পরিষ্কার স্বচ্ছ পানি | সে একটু পানি মুখে পুরল, বরফ-সম ঠান্ডা | সে কিছু পানি মাথায় দিল, প্রচন্ড শান্তি অনুভত হল | তারপর দ্বিধা না করে একেবারে টিনের চালের নিচে গড়িয়ে পড়া পানিতে গোছল শুরু করে দিল | সে বলতে লাগল, How sweet the wateris ! it is honey. I like to drink it . এই বলে সে চোয়ালে পানি নিয়ে মুখে পুরে পান লাগল | আমিও তার সাথে ভিজছি আর পানি পান করছি | মনে মনে বলছি, আহা! এই পানি যদি ধরে রেখে সারা বছর পান করতে পারতাম ! ওদিকে বাড়ির ভাই ভাবিরা উঠে দেখে আমরা দুজনে গোছল করছি |
রাত দশটায় ক্যাটরিনার বিমান ঢাকা ছাড়বে | সন্ধ্যা সাতটায় আমরা সেখানে হাজির | বোর্ডিংপাস, তারপর বিদায় | আমি হাত নাড়ছি | পেছন থেকে কে যেন আমাকে ডাকছে, তাকিয়ে দেখি কারিনা | সে কোন দ্বিধা না করে আমাকে ঝাপটে ধরেছে আর জোরে জোরে বলছে, আমি তোমায় ভালবাসি হক | আমার দৃষ্টি ক্যাটরিনার দিকে | মনে মনে বলে উঠলাম, আমিও তোমায় ভালবাসি ক্যাটরিনা, একেবারে বিশুদ্ধ ভালবাসা | ততক্ষণে ক্যাটরিনা আমার দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গিয়েছে |