স্বাধীন বাংলাদেশের নির্মাণ ও সুরক্ষা কীরূপে?
ফিরোজ মাহবুব কামাল
www.drfirozmahboobkamal.com/blog/স্বাধীন-বাংলাদেশের-নির্ম/
দাফন করতে হবে একাত্তরের বয়ান
কোন দেশকে পাল্টাতে হলে সর্বপ্রথম সে দেশের রাজনীতির মাঠের বয়ানকে পাল্টাতে হয়। কারণ, বয়ানই নির্ধারিত করে রাজনীতির অঙ্গণে কোনটি কাঙ্খিত ও প্রশংসিত কর্ম এবং কোনটি ঘৃণার বিষয় ও পরিতাজ্য। একাত্তরের ভারতীয় বয়ানে বিচিত্র ভাষা, বিচিত্র বর্ণ ও বিচিত্র এলাকার মুসলিমদের নিয়ে পাকিস্তানের ন্যায় বৃহৎ ও শক্তিশালী একটি মুসলিম রাষ্ট্র নির্মাণের বিশাল কাজটি নন্দিত না হয়ে বরং নিন্দিত হয়েছে। ইসলাম বিবর্জিত সে বয়ানে পাকিস্তানের সৃষ্টিই এক অনাসৃষ্টি রূপে চিত্রিত হয়েছে। পাকিস্তানের সৃষ্টিকে ভারত ভাগের অপরাধ রূপে চিত্রিত করা হয়েছে। এটি নিরেট ভারতীয় হিন্দুয়ানী বয়ান। এবং এ বয়ানে একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙাকে যথার্থ বলা হয়েছে।
যতদিন বাংলাদেশের মাটিতে একাত্তরের এই ভারতীয় বয়ান বেঁচে থাকবে -ততদিন এদেশে স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচার কাজটি অসম্ভব হবে। তখন বাংলাদেশের সৃষ্টিও তাদের কাছে অনাসৃষ্টি মনে হবে। কারণ খোদ বাংলাদেশ বহন করে পাকিস্তানের লিগ্যাসি। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল বলেই ১৯৪৭’য়ের পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র নিয়ে বাংলাদেশ নির্মিত হয়েছে। তাই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাকে অবৈধ বললে বাংলাদেশেরও বৈধতা থাকে না। তখন স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষ দাঁড়ানো চিত্রিত হয় ভারত বিরোধীতা রূপে। তখন স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে যারা বাঁচতে চায় তাদেরকে শহীদ হতে হয় ভারতসেবীদের হাতে -যেমনটি হয়েছে আবরার ফাহাদ ও আবু সায়ীদ।
একাত্তর নিয়ে ভারতীয় বয়ান বেঁচে থাকলে বৈধতা সৃষ্টি হবে ভারতের একাত্তরের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকৃতির। একাত্তরের এ বয়ান চরিত্র হনন করে সেসব রাজাকারদের -যারা একাত্তরে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তান ভাঙার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল। সামর্থ্য সীমিত জেনেও তারা ভারত ও তার সেবাদাস মুক্তি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধে খাড়া হয়েছিল। বাংলাদেশের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিরর অঙ্গণ থেকে একাত্তরের হিন্দুত্ববাদী বয়ান নির্মূল করতে না পারলে বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যত নাই। একাত্তরে পাকিস্তানের পক্ষ নেয়ার জন্য যুগ যুগ তারা শুধু নিন্দিতই হতে থাকবে। তখন অসম্ভব থেকে যাবে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ। হিন্দুত্ববাদী ভারত এবং তাদের বাংলাদেশী সেবাদাসগণ তো সেটিই চায়।
জাতীয়তাবাদ বিপন্ন করবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে
জাতীয়তাবাদ যেমন ইসলাম থেকে দূরে রাখে, তেমনি দূরে রাখে অন্য ভাষা ও অন্য দেশের মানুষ থেকে। তখন সে বিচ্ছন্ন মুসলিম দেশকে কবজা করা শত্রু দেশের জন্য সহজ হয়। একাত্তরের জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার বয়ান নিয়ে বাংলাদেশীদের পক্ষে অসম্ভব হবে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক মজবুত করা। তখন বাংলাদেশ নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে। অথচ একমাত্র পাকিস্তানই পারে সম্ভাব্য ভারতীয় আগ্রাসনের মুখে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে। পাকিস্তানের সে সামর্থ্য সৌদি আরব বুঝে। তাই সৌদি আরব পাকিস্তানের সাথে সামরিক চুক্তি করেছে। চুক্তি মোতাবেক এক দেশের উপর হামলা হলে সেটি সৌদ আরব ও পাকিস্তান - উভয় দেশের উপর হামলা রূপে গণ্য হবে। এটি ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে এক বিশাল অগ্রগতি। পাকিস্তানের রয়েছে পারমাণবিক বোমা, দূর পাল্লার বালিস্টিক মিজাইল ও সুপার সনিক যুদ্ধ বিমান নির্মাণের সামর্থ্য। একমাত্র পাকিস্তানই পারে ইসরাইলের মোকাবেলা করতে। এবং পারে ভারতের মোকাবেলা করতে। সৌদি আরব জানে, তার একার পক্ষে ইসরাইলের মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। তাই তারা পাকিস্তানের দ্বারস্থ হয়েছে। এ চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস পাল্টে দিবে।
একই অবস্থা বাংলাদেশের। ভারতীয় হামলার মোকাবেলার সামর্থ্য বাংলাদেশের নাই। অথচ ভারতের দয়ার উপর কখনোই বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাঁচতে পারে না। স্বাধীনতা ভিক্ষার বিষয় নয়। স্বীধনতা লড়াই করে অর্জনের বিষয়। লড়াই করতে চাই সামরিক শক্তি। স্বাধীনতা তাই শুধু জনশক্তি ও অর্থনৈতিক শক্তিতে বাঁচে না, সে কাজে সামরিক শক্তির বিকল্প নাই। সে সামর্থ অর্জনে অবশ্যই উন্নত অস্ত্র ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু খুঁজতে হয়। যেমন রুশ ভীতি নিয়ে বন্ধু খুঁজেছে জার্মানী, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেনের ন্যায় ইউরোপীয় দেশগুলি। সে দেশগুলির চেয়ে বাংলাদেশ শক্তিশালী নয়। তাই এই মুহুর্তে বন্ধু খোঁজার চেয়ে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোন পররাষ্ট্র নীতি নাই।
বুঝতে হবে, চীন কখনোই বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করবে না। কারণ ভারতের সাথে যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি চীন কখনোই নিবে না। তাছাড়া বাংলাদেশের যুদ্ধ কখনোই চীনের যুদ্ধ নয়। বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও ১৯৭১’য়ে চীন পাকিস্তানের পাশে দাঁড়ায়নি। চীন তার অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়াকে বেশি প্রাধান্য দেয়। ভারতে চীনা পণ্যের বিশাল বাজার, পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে চীন সে বাজার হারাতে চায় না। অপর দিকে ভারতের সাথে পাকিস্তানের যুদ্ধ লেগেই আছে; মাঝে মাঝে বিরতি আছে মাত্র। বাংলাদেশকে পাশে পেলে পাকিস্তান বরং একাত্তরের বদলা নিতে আগ্রহী হবে। পাকিস্তান এজন্যই বাংলাদেশকে কাছে পেতে চায়। ১৯৪৭’য়ের যে মুসলিম ভাতৃত্ববোধ, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ভারতভীতি পূর্ব ও পশ্চিমের দুটি পৃথক অঞ্চলকে এক পাকিস্তান বানিয়েছিল -তা আজও বেঁচে আছে। ফলে একমাত্র পাকিস্তানই হতে পারে বাংলাদেশের একমাত্র নির্ভরযোগ্য বন্ধু। কারণ, ভারত উভয় দেশেরই চির শত্রু।
বিএনপি রাজনীতিতে হাসিনার বয়ান
যারা একাত্তরে ভারতের নিমক খেয়েছে, সেসব ভারতসেবীরা পাকিস্তানের সাথে বন্ধুত্ব হতে দিবেনা। তাদের রয়েছে প্রচণ্ড ভারত প্রেম। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে ততটা ভাবে না, যতটা ভাবে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে। সে ভাবনা নিয়েই এই ভারতসেবীরা একাত্তরে নিজ দেশ পাকিস্তান ভেঙে ভারতকে বিজয়ী করেছে। এখনো তারা ভারতীয় ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবে না। এরাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রকৃত শত্রু। এরা ১৯৭১’য়ে পাকিস্তানের পরাজয় এনেছে, এখন পরাধীনতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশেরও। সেটিই ছিল হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের এজেন্ডা। হাসিনার পতন হয়েছে, কিন্তু হাসিনার সে লিগ্যাসি নিয়ে রাজনীতি করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। কারণ তারা উভয়ই অভিন্ন জাতীয়তাবাদী হারাম রাজনীতির ফসল। এ রাজনীতির বাইরে যাওয়ায় তাদের কোন আগ্রহ নাই। এজন্যই একাত্তরের পাকিস্তানপন্থীদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার যে বয়ান ছিল, সে অভিন্ন বয়ান ধ্বনিত হচ্ছে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মুখে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাঁচাতে হলে একাত্তর নিয়ে ভারতীয় বয়ানকে অবশ্যই পাল্টাতে হবে। এ বয়ানের মূল কথা ছিল: ১). প্যান-ইসলামীজম তথা ইসলামের বিশ্ব ভাতৃত্বের ধারণার নির্মূল, ২).জাতীয়তাবাদ, ৩). সেক্যুলারিজম, ৪).পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও যুদ্ধ এবং ৫). ভারতের প্রতি প্রেম এবং ভারতকে বিজয়ী করার যুদ্ধ। এরূপ ভারতসেবী ও পাকিস্তানবিরোধী বয়ান নিয়ে কখনোই পাকিস্তানের মিত্র হওয়া যাবে না। এ বয়ান ছিল হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের। এখন সে অভিন্ন বয়ান নিয়ে রাজনীতি করছে বিএনপি’র নেতাকর্মীগণ। এ বয়ান ভারতের গোলামী দেয়, স্বাধীনতা দেয় না। এ বয়ান ইসলামের শত্রু বানায়, পক্ষে আনে না।
কিছু কাল আগে ২০২৫ সালে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও উপ-প্রধানমন্ত্রী জনাব ইসহাক দার তাঁর বাংলাদেশ সফর কালে যথার্থই বলেছেন। তিনি বলেছেন সামনে এগুতে হলে তথা পাকিস্তানে সাথে বন্ধুত্ব গড়তে হলে বাংলাদেশীদের অবশ্যই দিল সাফ করতে হবে। অর্থাৎ রাজনীতির বয়ান পাল্টাতে হবে। ১৯৭১’য়ের ভারতীয় বয়ান আস্তাকুড়ে ফেলে ১৯৪৭’য়ের বয়ান ধারণ করতে হবে। ১৯৪৭’য়ের সে বয়ান হলো ইসলামের বিশ্বজনীন ভাতৃত্বের -যা অন্য ভাষী ও অন্য দেশের মুসলিমদের অকৃত্রিম ভাই ভাবতে শেখায়। এখানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কোন স্থান নাই। অবাঙালি মুসলিমদের ঘৃণা করার কোন বৈধতা নাই। ইসলাম তো চিরকাল এটিই শিখিয়েছে।
পৌত্তলিকতা নিয়ে যেমন মুসলিম হওয়া যায় না, তেমনি জাতীয়তাবাদের হারাম চেতনা নিয়ে ঈমানদার হওয়া যায় না। আর ঈমানদার না হলে অবাঙালি মুসলিমদের প্রকৃত বন্ধু হওয়া যায় না। সেজন্য প্রয়োজন হলো জাতীয়তাবাদী ধারণামুক্ত ঈমানদার হওয়া। কিন্তু সে বিশুদ্ধ ইসলামী চেতনা নিয়ে বাঁচতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ যেমন রাজী নয়, তেমনি রাজী নয় বিএনপির নেতাকর্মীগণ। তারা চায় জাতীয়তাবাদের জাহিলিয়াত নিয়ে বাঁচতে। মূর্তিপূজারী যেমন মূর্তি পূজা নিয়ে গর্বিত, জাতীয়তাবাদীরা তেমনি গর্বিত তাদের জাতি পূজা নিয়ে। মূর্তিপূজারী ভারত চায়, বাংলাদেশীরা বাঁচুক জাতি পূজা নিয়ে। মূর্তিপূজারী ও জাতিপূজারী -এ উভয় জাতের পূজারীরাই পরস্পরের কাজিন। ভারত জানে, জাতীয়তাবাদের অহংকার অসম্ভব হবে পাকিস্তানসহ মুসলিম দেশগুলির সাথে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা।
ভারত আরো জানে, জাতীয়তাবাদী হারাম চেতনার কারণেই একাত্তরে তারা ভারতের কোলে গিয়ে উঠেছিল, বাংলাদেশীদের চেতনায় সে জাতীয়তাবাদী চেতনাটি বাঁচলে তারা সব সময়ই ভারতের কোলে আশ্রয় নিয়ে বাঁচাকে গুরুত্ব দিবে এবং দূরে থাকবে ইসলামের বিশ্বজনীন ভাতৃত্ববোধ থেকে।
মূর্তিপূজারীগণ দুর্গাপূজারী হোক বা গনেশ পূজারী হোক -উভয়ই সমান পৌত্তলিক। তেমনি জাতীয়তাবাদীরা - আওয়ামী ঘরানার হোক বা বিএনপি ঘরানার হোক উভয়ই সমান জাতীয়তাবাদী। ফলে উভয় ঘরানার জাতীয়তাবাদীদের কাছেই ভারত অতি প্রিয়। তারাও অতি প্রিয় ভারতের কাছে। হাসিনার পলায়নের পর বিএনপিকে বেছে নিতে ভারতের তাই কোন আপত্তি হয়নি। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য বিপদ শুধু আগ্রাসী ভারত নয়, ভারতসেবী এই সেক্যুলার জাতীয়তাবাদীরাও। এরা যেমন মুসলিম পাকিস্তানের বন্ধু হতে পারিনি, বন্ধু হতে পারবে না মুসলিম বাংলাদেশেরও। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে ভাবে -এ বিষয়টি তাদের বুঝতে হবে। একমাত্র ইসলামপন্থীরাই হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রকৃতি রক্ষক। সেটি তাদের কাছে স্রেফ রাজনীতি নয়, বরং পবিত্র ইবাদত।