ভারতের বিজয়, পাকিস্তানের বিভক্তি এবং বাংলাদেশীদের উৎসব
ফিরোজ মাহবুব কামাল
www.drfirozmahboobkamal.com/blog/ভারতের-বিজয়-পাকিস্তানের/
বিবেকবান মানুষ কারো ঘর ভাঙলেও দুঃখ পায়। আর যে অপরাধী মানুষের ঘরে আগুন দেয় -সে তো ঘরের আগুন নিয়ে উৎসব করে। পাকিস্তানের মত একটি মুসলিম রাষ্ট্র ভেঙে গেল অথচ মনে কোন কষ্টই পেল না -এমন ব্যক্তি নামাজী, রোজাদার ও হাজী হতে পারে, কিন্তু সে প্রকৃত ঈমানদার হতে পারে না। কারণ, নামাজী, রোজাদার ও হাজী হতে ঈমানদার হওয়া লাগে না। অসংখ্য সূদখোর, ঘুষখোর, মিথ্যাবাদী, ব্যাভিচারী, প্রতারক বেঈমানও সেগুলি পালন করে। আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের মত মুনাফিক সর্দারও নামাজ রোজা পালন করতো। ঈমানদার হতে হলে শুধু আল্লাহ তায়ালার উপর বিশ্বাস থাকলে চলে না, তাঁর এজেন্ডার সাথে পূর্ণ একাত্ম হওয়ার সামর্থ্য থাকতে হয়। মহান আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছাকেই নিজের ইচ্ছা বানিয়ে নিতে হয়।
মহান রব চান, মুসলিম উম্মাহর একতা। নবীজী (সা:)’র ভাষায় মুসলিম উম্মাহ হলো একটি দেহ। দেহ থেকে একটি হাত’কে কোপ দিয়ে বিচ্ছন্ন করলে সমগ্র দেহ বেদনায় কেঁপে উঠে। তাই পাকিস্তান ভেঙে যাওয়াতে শুধু পাকিস্তান, ভারত ও কাশ্মীরসহ সমগ্র বিশ্বের মুসলিমগণ গভীর ভাবে বেদনাসিক্ত হয়েছে। তেমনটি না হলে বুঝতে হবে, দেহটি মৃত। মৃত দেহকে পুড়িয়ে ফেললেও ক্রন্দন উঠে না। অপর দিকে দেহ থেকে ছিটকে পড়া কোন হাতকে আগুনে ফেললেও তাতে দেহে কোন বেদনা উঠে না। সে প্রাণহীন বিচ্ছিন্ন হাতটিকে আগুনে ভস্মীভূত করলেও সে হাত ব্যাথা পায় না। সে বেদনার জন্য দেহের সাথে সংযোগটি জরুরি। মুসলিম দেশ ভাঙলেও যে ব্যক্তির হৃদয়ে কোন বেদনা জাগে না -সে হলো সে প্রাণহীন বিচ্ছিন্ন হাতটির মত।
মুসলিমদের জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার রয়েছে সুনির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা। সেটি হলো ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও ভৌগলিকতার উর্দ্ধে উঠে মুসলিম উম্মাহর মাঝে প্যান ইসলামী একতা। তিনি চান, তাঁর জমিনে প্রতিষ্ঠা পাবে একমাত্র তাঁর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া আইন। অন্য কারো সার্বভৌমত্ব এবং অন্য কারো আইনের স্থান তাঁর জমিনে নাই। এক্ষেত্রে আপোষের কোন স্থান নাই। নবীজী (সা:)’র ভূ-রাজনৈতিক মূল এজেন্ডা ছিল মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করা। সে লক্ষ্য পূরণে অপরিহার্য ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। কারণ, এমন রাষ্ট্র কাজ করে সে মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার হাতিয়ার রূপে। এমন রাষ্ট্রে প্রতিটি ঈমানদার পায় পূর্ণ দ্বীন পালনের স্বাধীনতা। তখন প্রতিষ্ঠা পায় কুর’আনের জ্ঞানদান, ইসলামের দাওয়াত, আদালতে শরিয়ত পালন, দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ। এমন পূর্ণ দ্বীন পালন নিয়ে বাঁচতে সে রাষ্ট্রে কেউ কাউকে বাধা দিবে না।
আল্লাহ তায়ালা চান, মুসলিমগণ বাঁচবে ভাষা, বর্ণ, আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ব নিয়ে। নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ মহান রব’য়ের সে পবিত্র ইচ্ছাকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রকে তিনি ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় ও অন্যায়ের নির্মূলে হাতিয়ারে পরিণত করেছিলেন। সমগ্র মানব ইতিহাসে সেটিই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম। নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের জান-মাল ও রক্তের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হয়েছিল সে সর্বশ্রেষ্ঠ কর্মকে সফল করতে। বাঙালি মুসলিমে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে মহান রব’য়ের এজেন্ডার সাথে একাত্ম হতে। বরং তাদের বিনিয়োগ বেড়েছে ভারতের হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডার সাথে একাত্ম হতে। তারই প্রমাণ, তারা একাত্তরে ভারতীয় শিবিরে গিয়ে উঠেছে। এবং ভারতের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে ভারতীয় সেনা বাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তান ভাঙতে যুদ্ধ করেছে। এবং ভারতকে বিজয়ী করেছে। এখন সে বিজয় নিয়ে প্রতি বছর উৎসব করে।
নবীজী (সা:) শুধু নামাজ-রোজা ও হজ্জ-যাকাতের সূন্নত রেখে যাননি, রেখে যান রাষ্ট্র নির্মাণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার সূন্নতও। রেখে যান, কিভাবে একাত্ম হতে হয় মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডার সাথে। নবীজী (সা:)’র সে সূন্নত মেনে আরব, ইরানী, তুর্কি, কুর্দি, হাবশী, মুর ইত্যাদি নানা পরিচয়ের মানুষ এক অভিন্ন রাষ্ট্রে শত শত বছর একত্রে বসবাস করেছে। মহান রব’য়ের ইচ্ছা পূরণে তাদের সে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা যথেষ্ট প্রতিদানও পেয়েছে। পরিণামে মুসলিমগণ পরিণত হয়েছিল সর্ববৃহৎ বিশ্বশক্তিতে।
কিন্তু আজকের মুসলিমগণ নবীজী (সা:)’র সে সূন্নত নিয়ে বাঁচে না। তারা মহান রব’য়ের এজেন্ডা নিয়েও বাঁচে না। এক্ষেত্রে বাঙালি মুসলিমদের অবাধ্যতা ও অপরাধ বিশাল। দেশের আদালত থেকে তারা শরিয়তী বিধানকে বিলুপ্ত করেছে, প্রতিষ্ঠা দিয়েছে কাফিরদের প্রণীত কুফুরি আইন। ফলে বাংলাদেশের আইনে জ্বিনাও বৈধ -যদি তা জ্বিনাকারীদের সম্মতিতে হয়। তারা সংবিধান থেকে বিলুপ্ত করেছে মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব, এবং প্রতিষ্ঠা দিয়েছে নিজেদের সার্বভৌমত্ব। একতার বদলে উৎসব হয় মুসলিম রাষ্ট্রের বিভক্তি নিয়ে। তাই বাঙালি মুসলিম জীবনে ১৬ ডিসেম্বরে এতো উৎসব। ১৬ ডিসেম্বরে উৎসবের কারণ, দিনটি হলো পৌত্তলিকদের সাথে জোট বেঁধে পাকিস্তান ভাঙার দিন। ভিলেন এখানে পাকিস্তান। উৎসব এখানে শয়তানের বিজয় নিয়ে। মহান রব’য়ের একটি মাত্র হুকুম অমান্য করার কারণ ইবলিস অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হয়েছে। অথচ অসংখ্য কুর’আনী বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরও কেন আজ মুসলিম রূপে দাবী করা হয়?
ইসলামের মৌল নীতির বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট ও কম্যুনিস্টদের বিদ্রোহটি বিশাল। তারা একাত্তরে একাত্ম হয়েছিল ভারতীয় পৌত্তলিক এজেন্ডার সাথে। সে এজেন্ডার মূল কথা ছিল পাকিস্তান ভাঙা এবং ভাষা ভিত্তিক মুসলিম উম্মাহর বিভক্তি। অথচ ঈমানদারকে শুধু তার নিজ গৃহ ও নিজ পরিবারকে ভালবাসলে চলে না। তাকে ভালবাসতে হয় অখণ্ড মুসলিম উম্মাহ ও মুসলিম দেশের অখণ্ড মানচিত্রকেও। মুসলিম উম্মাহর অঙ্গহানীর বেদনা তাঁর কাছে গভীর। তাই যখন খেলাফত ভাঙার ষড়যন্ত্র হয়, তখন প্রচণ্ড বেদনাসিক্ত হয়েছিল বিশ্বের প্রতিটি ঈমানদারের মন। তাদের হৃদয়ে কান্নার রোল উঠেছিল। ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমগণ সে বেদনা নিয়ে খেলাফত বাঁচাতে রাজপথে আন্দোলনে নেমেছিল। অথচ সেদিন গাদ্দারীতে ইতিহাস গড়েছিল আরব বিশ্বের সেক্যুলারিস্ট, ন্যাশনালিস্ট, কম্যুনিস্ট ও রাজতন্ত্রীরা। তারা খেলাফত ভাঙতে ইংরেজ ও ফরাসী কাফিরদের সাথে কোয়ালিশন গড়েছিল। নেকড়ে যেমন সব দেশে একই রূপ হিংস্র। বেঈমানগণ তেমনি সব দেশে একই রূপ বেঈমান। তাদের একই রূপ গাদ্দারী মহান আল্লাহ তায়ালার দ্বীনী ও ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডার সাথে।
ঈমানী বন্ধনের কারণেই ১৯৭১’য়ের ১৬ ডিসেম্বর যখন পাকিস্তান ভেঙে যায়, সেদিন বেদনায় কেঁদে উঠেছিল বিশ্বের তাবৎ মুসলিমের হৃদয়। সেদিন কেঁদেছে ভারত, কাশ্মীর ও মায়ানমারের বহু মুসলিম। সেটি তো অঙ্গ ছেদের বেদনা। অথচ পাকিস্তান ভাঙার আনন্দে ভারতের কাফেরদের সাথে মিলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট, কম্যুনিস্ট ও সেক্যুলারিস্টগণ ১৯৭১’য়ে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় উৎসব করেছে। এমন কি বহু ইসলামপন্থীরাও এ দিনে উৎসবে নামে। প্রশ্ন হলো, মুসলিম দেশের বিভক্তি নিয়ে উৎসব করা কি ঈমানের লক্ষণ? এটি তো ইসলাম থেকে বিচ্যুতির লক্ষণ। নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ও হাজার হাজার মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে কি সে বিচ্যুতি ঢাকা যায়? সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে এটি এক নতুন বিদ’আত। এর আগে মুসলিমগণ কখনোই কাফেরদের সাথে মিলে একত্রে বিজয় উৎসব করেনি। কারণ, কাফেরদের যাতে বিজয়, মুসলিমদের তাতে বিপর্যয়। তেমনি মুসলিমদের যাতে বিজয় ও উৎসব, কাফেরদের তাতে পরাজয় ও মাতম। মুসলিমের বিজয় এবং কাফিরদের বিজয় কখনোই একই রণাঙ্গণে একত্রে হয়না। ফলে উভয়ের উৎসব কি করে একত্রে হয়?