এ নির্বাচনে কবর হোক পরিবারতন্ত্রের
ফিরোজ মাহবুব কামাল
www.drfirozmahboobkamal.com/blog/এ-নির্বাচনে-কবর-হোক-পরিবা/
বিশুদ্ধ ইসলাম পরিবারতন্ত্রকে করব দিয়েছিল
রাজতন্ত্রের আরেক রূপ হলো পরিবারতন্ত্র। রাজতন্ত্রের ন্যায় পরিবারতন্ত্রও যেমন গণতন্ত্র বিরোধী, তেমনি মানবতা বিরোধীও। শাসক নির্বাচনের এ রীতি কখনোই কোনো সভ্য, উন্নত ও ঈমানদার জনগণের রাজনৈতিক পদ্ধতি হতে পারে না। ইসলাম তার সর্বশ্রেষ্ঠ যুগে এই জাহিলী প্রথাকে কবর দিয়েছিল। খলিফা হযরত আবু বকর (রা:) এবং খলিফা হযরত ওমর (রা:) ছিলেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক। তাদের উভয়েরই যোগ্য সন্তান ছিল। কিন্তু তারা তাদেরকে শাসক হিসেবে নিযুক্তি দিয়ে যাননি। এবং জনগণকেও বলেননি তাদেরকে সমর্থন দিতে। তখন শাসক নির্বাচিত হয়েছেন পরিবারের বাইরে থেকে এবং পরামর্শের ভিত্তিতে। এটিই বিশুদ্ধ ইসলাম। পরবর্তীতে মুসলিম দেশে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ইসলাম থেকে দূরে সরার কারণে।
মুসলিমদের উচিত খোলাফায়ে রাশেদার সে মহান নীতি অনুসরণ করা। তারা সেদিন যেভাবে পরিবারতন্ত্র বা রাজতন্ত্রকে দাফন করেছিলেন, আজও প্রতিটি মুসলিম ভূমিতে তা দাফন করা উচিত। ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে রাজতন্ত্র তথা পরিবারতন্ত্রকে দাফন করা হয়েছে, অথচ মুসলিমগণ সে অসভ্য আদিম পদ্ধতিকে দাফন করেছিল সাড়ে চৌদ্দ শত বছর পূর্বেই। এর থেকে বোঝা যায় ইসলাম কত আধুনিক, কত মানবিক এবং কত গণতান্ত্রিক। ইসলামের শ্রেষ্ঠ খলিফাগণ পরিবারতন্ত্রকে দাফন করে প্রমাণ রেখে গেছেন সে আদিম শাসনপদ্ধতি ইসলামসম্মত নয়; তাতে কল্যাণ নাই মুসলিমদের। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো পরিবারতন্ত্র আজও বেঁচে আছে বাংলাদেশে।
পরিবারতন্ত্র ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়
বাংলাদেশে পরিবারতন্ত্রের কুফলটি অতি ভয়ানক এবং বেদনাদায়ক। পরিবারতন্ত্র ছিল বলেই এদেশে শাসন ক্ষমতায় বসবার সুযোগ পেয়েছে হাসিনার ন্যায় অতি নৃশংস ফ্যাসিস্ট। পরিবারতন্ত্রের কারণেই মুসলিম উম্মাহ পেয়েছিল এজিদের ন্যায় অতি বর্বর এক জালেম শাসককে। সে বর্বর এজিদের হাতে মুসলিম উম্মাহ এক মহা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। মুসলিম বিশ্বে যত জালিম শাসকের উদ্ভব হয়েছে তাদের অধিকাংশই এসেছে রাজতন্ত্রের পথ বেয়ে। তাই অতি দুর্বল গণতান্ত্রিক পদ্ধতিও রাজতন্ত্র বা পরিবারতন্ত্রের চেয়ে অনেক শ্রেষ্ঠ। কারণ সেখানে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা কম এবং প্রতিষ্ঠা পায় জনগণের কাছে জবাবদেহীতা।
পরিবারতন্ত্রে শিক্ষা ও যোগ্যতার অবমাননা হয়। যোগ্যতার বদলে এতে গুরুত্ব পায় পূর্ববর্তী শাসকের সাথে রক্তের সম্পর্ক। আওয়ামী লীগে হাসিনার চেয়ে অনেক শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ছিল, কিন্তু তারা পরিবারতন্ত্রের কারণে গুরুত্ব পায়নি। তারা গুরুত্ব পেলে দেশ নৃশংস ফ্যাসিবাদের দিকে ধাবিত হতো না। তাতে দেশ বাঁচতো এবং আওয়ামী লীগও বাঁচতো। এজিদের ন্যায় বর্বর জালেম শাসকগণ যখন ক্ষমতায় এসেছিল তখনও মুসলিমদের মাঝে অনেক শিক্ষিত, অভিজ্ঞ ও ঈমানদার লোক ছিল -যারা মুসলিম উম্মাহর উত্তম শাসক হতে পারতেন। কিন্তু পরিবারতন্ত্র বা রাজতন্ত্র সে সভ্য প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করে দেয়। এতে ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মুসলিম উম্মাহ। পরিবারতন্ত্রের কারণেই অতি নৃশংস ভাবে প্রাণ হারাতে হয়েছে ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান ইমাম হোসেন এবং তার সাথে আরো অনেককে। ইসলামের ইতিহাসে এমন ঘটনা বারবার ঘটেছে।
পরিবারতন্ত্র গণতন্ত্র ও যোগ্য মানুষদের শত্রু
পরিবারতন্ত্র গণতন্ত্রের শত্রু এবং শত্রু সমাজের শিক্ষিত ও যোগ্য মানুষদেরও। তাই এটি কখনোই কোন সভ্য মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিএনপি আওয়ামী লীগের মতোই পরিবারতন্ত্র নিয়ে সামনে এগোচ্ছে। এবং পরিবারতন্ত্রের কারণেই বিএনপি আরেক আওয়ামী লীগের পরিণত হতে যাচ্ছে। অথচ বিএনপিতেও অনেক যোগ্য ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ রয়েছে। কিন্তু পরিবারতন্ত্র সে যোগ্য লোকদের জন্য সামনে এগুনোর রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে।
পরিবারতন্ত্রে নেতা হতে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা কোন কিছুই লাগে না। লাগে শুধু পূর্ববর্তী শাসকের সাথে রক্তের বা বৈবাহিক সম্পর্ক। এ পদ্ধতিতে রক্তের সম্পর্কের খাতিরে এমনকি অযোগ্য ও অশিক্ষিত ব্যক্তিও নেতা হতে পারে। এটি প্রাচীন গোত্রবাদের সংস্কৃতি। এর চেয়ে অধিক অসভ্য ও পশ্চাৎপদ নীতি আর কি হতে পারে? কোন সভ্য জনগোষ্ঠী কি এমন পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে? সেরূপ একটি রীতির কারণে শাসক পরিবারের সদস্যরা নিজেদের শিক্ষিত ও যোগ্যতর করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনা। তারেক জিয়া এ কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি। অথচ পরিবারতন্ত্র না থাকলে তাকে অবশ্যই লেখাপড়ায় মনযোগী হতে দেখা যেত। সমাজে সৎ ভাবে বাঁচার তাগিদেই তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হতো।
বাংলাদেশের একটি সভ্য পরিবারের প্রধানও তার সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী বানাতে চায়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পেলে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়। তেমনি চায় তার কন্যাকে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীর সাথে বিয়ে দিতে। পরিবারতন্ত্রের অহংবোধ সে ভদ্র ও সুবোধ নীতিকে হত্যা করে। ফলে তারেক জিয়া তার নিজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুরুত্বই বুঝেননি। বুঝতে হবে রাষ্ট্র চালানোর কাজটি কবিতা বা গল্প লেখা নয় যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রি না নিয়েও রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল হওয়া যায়। সফল রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য উচ্চ শিক্ষা ও জ্ঞানের বিকল্প নাই।
বাংলাদেশের মত একটি দেশেও জেলা বা থানার প্রশাসক হতেও যোগ্যতা লাগে। সে পদে নিয়োগ প্রাপ্তির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাগে, বিসিএস পাস করতে হয় এবং চরিত্র ও মেধার পরিচয় রাখতে হয়। এমন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাগে। লাগে দীর্ঘ দিনের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা। কিন্তু পরিবারতন্ত্রে এসব যোগ্যতার কিছুই লাগেনা। শুধ লাগে পূর্বের শাসকের স্ত্রী বা সন্তান হওয়ার যোগ্যতা। একটি দেশে এ রকমের পরিবারতন্ত্র বা রাজতন্ত্র দেখে বুঝা যায়, দেশটি জনগণ কতটা অসভ্য, অযোগ্য, অনগ্রসর ও মধ্যযুগীয়। কখনোই কোন সভ্য ও ভদ্র মানুষের দেশে এ রকম মধ্যযুগীয় পরিবারতন্ত্র বাঁচতে পারে না। এ অসভ্য নীতি বাঁচতে পারে না বাংলাদেশেও।
কবর হোক পরিবারতন্ত্রের
পরিবারতন্ত্র যেমন দেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্র চর্চাকে ব্যাহত করে, তেমনি বাধা সৃষ্টি করে দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা। পরিবারতন্ত্রের কারণেই আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়নি। একই কারণে বিএনপির মধ্যেও গণতন্ত্রচর্চা প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে না। এমন পরিবারতন্ত্র সহজেই নৃশংস ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়। তাতে অসম্ভব হয় সভ্য রাষ্ট্র নির্মাণের প্রক্রিয়া। তাই যে দলে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় জনগণের উচিত সে দলকে নির্বাচনে পরাজিত করা। খুবই ভালো হতো যদি এবারের হ্যাঁ ও না’র গণভোটে পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণের রায় নেয়া হতো। তখন সম্ভব হতো সাংবিধানিকভাবে পরিবারতন্ত্রকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা। বুঝতে হবে পরিবারতন্ত্রের এ অসভ্যতা বাঁচিয়ে রাখাই বড় অসভ্যতা। সে অসভ্যতার স্থান নতুন বাংলাদেশে হতে পারেনা। এ নির্বাচন সুযোগ দিয়েছে পরিবারতন্ত্রকে কবর দেয়ার। ০৯/০২/২০২৬
--
You received this message because you are subscribed to the Google Groups "PFC-Friends" group.
To unsubscribe from this group and stop receiving emails from it, send an email to pfc-friends...@googlegroups.com.
To view this discussion visit https://groups.google.com/d/msgid/pfc-friends/CAOPyTwQXG0544X4-C3zbGGn8J9nNvqaarOvTOsz27uHXfgBShw%40mail.gmail.com.