ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং যে হয়েছে সেটি বুঝার উপায় কি
এবং প্রতিকার কিরূপে?
ফিরোজ মাহবুব কামাল
www.drfirozmahboobkamal.com/blog/ইলেকশন-ইঞ্জিনিয়ারিং-যে/
নির্বাচনি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো
আগে দেশ জয়ে যুদ্ধ করতে হতো। উন্নত বিশ্বে দেশ শাসনের অধিকার পেতে সুষ্ঠ নির্বাচনে ভোটে জিততে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিশর -এসব দেশে নির্বাচনে জিততে জনপ্রিয় হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সামর্থ্য থাকলেই চলে। এটি কোন রকেট সায়েন্স নয়। ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং করার পর্যাপ্ত সামর্থ্য ও অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রীয় শক্তির থাকে। তাছাড়া তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা মার্কিন রাষ্ট্র, ভারত, ইসরাইল - এ ধরনের বিদেশী শক্তির অতি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। যে দেশে নির্বাচন থাকে না, সেসব দেশে তারা সামরিক বা বেসামরিক স্বৈর শাসনের অপসারণ ঘটায় সামরিক ক্যুর মাধ্যমে। জনগণের ভোটের অধিকার থাকলে সেখানে দেশ দখলে বেছে নেয়া হয় ভোট জালিয়াতি তথা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পথ। ইচ্ছামত সরকার বদলানোর এটি সহজতম এবং কম ব্যয়বহুল পথ। পাকিস্তানে সে পদ্ধতির প্রয়োগ করক হয়েছে স্বাধীনচেতা ইমরান খানের সরকারকে হটিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে। সে অভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমেই গণতন্ত্রের চাকা মিশর ও তিউনিশিয়াতে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছে। সেসব দেশে আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে স্বৈরাচার। বাংলাদেশেও তেমনি হাসিনার ফ্যাসিবাদ ফিরিয়ে আনার জন্য ভারত চেষ্টা কববে -সে সম্ভাবনা তো থেকেই যায়।
বাংলাদেশের সমস্যা হলো, ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে বিতাড়িত করা সম্ভব হলেও দেশের সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনে এখনো রয়ে গেছে হাসিনার হাতে গড়া বিশাল এক অনুগত বাহিনী। ফ্যাসিবাদের এ দোসররাই গণতন্ত্রের শত্রু। এদের কোয়ালিশন এখন বিএনপির সাথে। বুঝতে হবে, হাসিনাপন্থীরাই এখন ভারতপন্থী। ক্ষমতায় রয়ে এখনো গেছে হাসিনার অনুগত প্রেসিডেন্ট শাহাবুদ্দিন চুপ্পু এবং হাসিনার আত্মীয় সেনাপ্রধান ওয়াকারুজ্জামান। এবং সেটি বিএনপির সমর্থনের কারণে। সে সাথে রয়ে গেছে বিগত ১৬ বছরের শাসনামলে হাসিনা সরকারের হাতে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসনের আমলারা।
বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতীয় এজেন্ডা
ভারত কখনোই চায় না বাংলাদেশে কোন ইসলামপন্থী জোট ক্ষমতায় আসুক। সেটি চায়না ভারতপন্থী হাসিনার লোকজনও। ফলে নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের পরাজিত করার নীল নকশা তৈরি হবে -সেটি অত্যন্ত স্বাভাবিক। তাদের হাতে রয়েছে সে নীল নকশা বাস্তবায়ের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও। প্রফেসর ইউনুস চাইলেও তাঁর সামর্থ্য ছিল না তাদের কাজে বাধা দেয়ার। এখানেই এবারেরর নির্বাচনের মূল সংকট।
তারেক রহমানসহ বিএনপির নেতাদের মধ্য যে ভারতপন্থী সুর সেটিই প্রমাণ করে বিএনপি জোট বেঁধেছিল এ ভারতসেবী জোটের সাথে। সাথে নিয়েছে আওয়ামী লীগকেও। বরং অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে বিএনপি আবির্ভুত হয়েছে নতুন আওয়ামী লীগ রূপে। আওয়ামী লীগের ভোটারগণ ভোট দিয়েছে বিএনপিকে। হাসিনা যেমন ভারতের বিরুদ্ধে কখনোই কোন উচ্চবাচ্য করেনি, তেমনি করেনি তারেক রহমান এবং বিএনপির অন্যান্য নেতারাও। ফলে এটি কাঙ্খিত ছিল যে, এবারের নির্বাচনে ভারত, বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন মিলে নির্বাচনে ইঞ্জিনীয়ারিং হবে ইসলামপন্থীদের পরাজিত করার কাজে।
Deep state: গণতন্ত্রের মূল শত্রু
সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ও গোয়েন্দাদের নিয়েই গড়ে উঠে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে শক্তিশালী deep state। তাদের সাথে যোগ দেয় বিচার বিভাগ, পুলিশ বিভাগ ও প্রশাসনিক বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাগণ। দেশ কোন দিকে পরিচালিত হবে সেটি নির্ধারণ করে deep state’য়ের নায়কগণ, জনগণ নয়। এরা জনগণের চোখের সামনে যেমন ক্ষমতার দম্ভ দেখায়, তেমনি ক্ষমতার কলকাঠি নাড়ে পর্দার আড়াল থেকে। দেশে ৫ বছর পর পর যে নির্বাচন হয় বটে, তবে সে নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ ভাবে হবে সেটি নির্ভর করে তাদের করুণার উপর। তাদের করণা পেলেই জনগণের ভোট দেয়ার অধিকার পায়। তবে ভোটের ফলাফল কি হবে এবং কারা ক্ষমতায় বসবে -সেটি ভোটারদের রায়ের উপর নির্ভর করেনা, সেটি নির্ধারিত করে deep state’য়ের কর্তারা। এরাই পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা ইমরান খানকে হটিয়ে কারাবন্দী করে রেখেছে। বাংলাদেশকে এরাই নির্বাচনে বারবার এরশাদকে বিজয়ী করেছে। বারবার হাসিনাকেও তারা বিজয়ী করেছে। এরূপ কারচুপি তাদের কাছে মামুলী ব্যাপার।
ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং করার ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী ও তার গোয়েন্দাদের সামর্থ্যটি বিশাল। জনগণের অর্থে পালিত এ সেনাকর্তারাই জনগণের ভোটের উপর ডাকাতি করে এবং দেশ দখলে নেয়। তখন জনগণ পরিণত হয় নিছক দর্শকে। পাকিস্তানের উপর দখল এদের। এরাই ইরাক, সিরিয়া, তিউনিশিয়া মত দেশগুলোতে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে শতকরা ৯৮ ভাগ ভোট পাইয়ে দিয়ে বার বার বিজয়ী করেছে। বাংলাদেশও ভিন্নতর নয়।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এই deep state গুলোই হলো গণতন্ত্রের মূল শত্রু। তাই শুধু হাসিনার ন্যায় ফ্যাসিস্টকে ক্ষমতা থেকে সরালে চলে না, গণতন্ত্র বাঁচে না। আধিপত্য খর্ব করতে হয় deep state’য়েরও। বুঝতে হবে, সামরিক বাহিনী ও তার গোয়েন্দা বিভাগে যারা বসে আছে তারা কেউ ফেরেশতা নয়। অতীতেও কোন সময় এরা ফেরেশতা ছিল না; ভবিষ্যতেও থাকবে না। এদের কাজই হলো কোন রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে কাজ করা ও সেটিকে সফল করা।
নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বৈর্গরাজ্য হলো পাকিস্তান। দেশটির deep state কিভাবে নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং করে তার উপর গবেষণা হয়েছে। সে গবেষণার কিছু ফলাফলের ভিত্তিতেই এ নিবন্ধের মূল আলোচনা। বস্তুত নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং শুরু হয় নির্বাচনের আগে থেকেই। সেটি প্রার্থী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। অনেক সময় শক্তিশালী প্রার্থীকে হত্যা করা বা কারাবন্দী করা হয়।পছন্দের লোকদের নিয়ে কোয়ালিশন গড়া হয়। নিয়ন্ত্রনে নেয়া হয় মিডিয়াকে। এবারের নির্বাচনে সেনাবাহিনী ও তার গোয়েন্দাদের যে সেরূপ মোটিভ ছিল -সেটি ধরা পড়ে বিএনপির নির্বাচনী প্রার্থী বাছাই থেকে। বিএনপির এক নেতাই প্রকাশ্যে বলেছেন, এবারের বিএনপির প্রার্থী সিলেকশন করে দিয়েছে ডিজিএফআই, এনএসআই ও পুলিশের গোয়েন্দারা। যারা নিজেরা একটি দলের প্রার্থী বাছাই করে দেয়, সেসব প্রার্থীদের বিজয়ী করায় তাদের যে পরিকল্পনা থাকবে -সেটিই স্বাভাবিক।
তাছাড়া বাংলাদেশের সেনাবাহিনী হলো ইসলাম থেকে দূরে সরা একটি সেক্যুলার প্রতিষ্ঠান। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় এদেরও রয়েছে প্রচণ্ড ইসলামভীতি। তাদের ভয়, ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় আসলে তারা ভারতসহ পাশ্চাত্য শক্তির কুনজরে পড়বে। তারা বিভিন্ন দেশে নিজেদের শ্রম বিক্রি করে অর্থ রোজগার করে। ফলে তাদের ভয়, ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় আসলে আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারে বিশেষ করে শান্তিরক্ষি রূপে কাজের ক্ষেত্রে তাদের কদর কমে যাবে। তাই আদর্শিক দিক দিয়ে তারা বিএনপি’র কাজিন, ফলে তারা ইসলামপন্থীদের পরাজিত করতে চাইবে -সেটিই স্বাভাবিক।
ইঞ্জিনিয়ারিং যে হয়েছে সেটি বুঝা যাবে কিরূপে?
প্রশ্ন হলো, নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে কি বুঝা যাবে কিরুপে? ম্যালেরিয়া, নিউমোনিয়া ইত্যাদি রোগ হলে তা বুঝা যায় রোগের সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখে। তেমনি লক্ষন থাকে নির্বাচনি ইঞ্জিনিয়ারিংয়েরও। অপরাধ বিজ্ঞানের কথা হলো, চোর ডাকাতগণ যত সতর্কতার সাথেই অপরাধ করুক না কেন, অপরাধের আলামত রেখা যায়। অপরাধীদের ধরতে হলে তাদের রেখে যাওয়া সে আলামতগুলি নিয়ে এগোতে হয়।
প্রতিটি অপরাধের পিছনে থাকে মটিভ। নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং যে হতে পারে -সেটি জানার জন্য প্রথমে দেখতে হয় সরকারের গভীরে যারা বসে আছে তাদের কোন মটিভ আছে কিনা। সরকারের গভীরে যারা বসে থাকে তারা উদ্ভিদ নয়। তাদের যেমন রাজনীতি থাকে, তেমনি রাজনীতির বিশেষ এজেন্ডাও আছে। আছে সে এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র। প্রতি নির্বাচনে সেগুলি গবেষণার বিষয়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির জনগণ অতি দুর্বল; কিন্তু সে তুলনায় শক্তিশালী হলো দেশের সামরিক বাহিনী ও তার গোয়েন্দারা। সব দেশের নেকড়েরাই সমান হিংস্র। তেমনি একই রূপ গণতন্ত্রী বিরোধী হলো তৃতীয় বিশ্বের সব দেশের সেনাবাহিনীর। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সে দানবীয় চরিত্র যেমন ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে দেখা গেছে, তেমনি দেখা গেছে ২০২৪ সালে জুলাই-আগস্টে। তাই তারা যে গণতন্ত্রপ্রেমী হবে সেটি কি আশা করা যায়?
নির্বাচনি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আলামত
এক): ফলাফলে জনজোয়ারের প্রতিফলন থাকে না
সুষ্ঠ নির্বাচনে অবশ্যই গণজোয়ারের চিত্র দৃশ্যমান হতে হয়। সেটি না হলে বুঝতে হবে, নিশ্চিত ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। এবারে ভোটের আগে ১১ দলীয় জোটের পক্ষে যে জনজোয়ার দেখা গেছে সেটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে অভুতপূর্ব। ১৯৭০ সালের নির্বাচন থেকে নির্বাচন দেখে আসছি। কিন্তু কখনোই এমন গণজোয়ার দেখিনি -যা ১১ দলীয় জোটের পক্ষে দেখিছি। ঢাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ ট্রেনে, স্টিমারে, লঞ্চে দাঁড়ি পাল্লার পক্ষে স্লোগান দিতে দিতে গ্রামে ফিরেছে। ১১ দলের পক্ষে বিশাল বিশাল জনসমুদ্র হয়েছে সমগ্র দেশ জুড়ে। সেরূপ জনজোয়ার বিএনপির পক্ষে দেখা যায়নি। একচ্ছত্র জোয়ার দেখেছি সোসাল মিডিয়াতে। শ্রেষ্ঠ ব্লগারগণ ছিল ১১ দলের পক্ষে। বিএনপি এর ধারে কাছেও ছিল না। ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের পক্ষে এরূপ জনজোয়ার দেখিনি। দেখা যায়নি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও। এমনকি Washington Post’য়ের ন্যায় বিদেশী পত্রিকাতেও এবারের ইসলামপন্থীদের পক্ষে জোয়ারের খবর ছাপা হয়েছে। বাংলাদেশের বহু নির্বাচনি জরিপেও সেটি দেখা গেছে। জনজোয়ারের সে প্রভাব নির্বাচনি ফলাফলে না থাকায় স্বভাবতঃই প্রশ্ন জাগে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের।
দুই). ভোটদান শেষ হলেও বলা হয়নি প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা
উদ্দেশ্য যখন ভোট ইঞ্জিনিয়ানরিং হয়, তখন ইচ্ছা করেই নির্বাচনে কতজন ভোট দিল - ভোটদান শেষ হলেও বলা হয়না সে সংখ্যাটি। এটি নির্বাচনি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পক্ষে সুস্পষ্ট দলিল। উদাহরণ দেয়া যাক। যদি বলা হয়, ভোটদানের পর পরই যদি বলা হয় মোট ৫ কোটি মানুষ ভোট দিয়েছে, তখন পরবর্তীতে তাতে জাল ভোট যোগ করার সুযোগ থাকে না। অথচ সারাদেশ কতজন ভোট দিয়েছে -সে পরিসংখ্যানটি ভোটদান শেষ হওয়ার মাত্র এক ঘন্টার মধ্যেই জানানো সম্ভব। কারণ, সেটির হিসাব অতি সহজ। নির্বাচনে কতগুলি ব্যালেট পেপারের বই ব্যবহৃত হয়েছে -সেগুলি যোগ করলেই জানা যেত। কিন্তু সে সংখ্যাটি নির্বাচনি কমিশন ভোটদান শেষ হওয়ার ৬ ঘন্টা পরও জানায়নি। বুঝা যায়, মতলব খারাপ ছিল বলেই সেটি করা হয়নি। সম্ভাবনা রয়েছে, সে ৬ ঘন্টার মধ্যে প্রচুর জাল ভোট যুক্ত করার।
তিন). অকস্মাৎ ফলাফল ঘোষণায় বিরতি এবং পরে ভিন্ন ফলাফল প্রচার
ভোট গণনা কালে বিশেষ একটি দলের প্রার্থীর ভোটে এগিয়ে যাওয়ার খবর শোনাতে শোনাতে প্রচার যখন হঠাৎ থামিয়ে দেয়া হয়, প্রচারে যখন বিলম্ব করা হয় এবং কিছু সময় পর উক্ত প্রার্থীর ভোটে পিছিয়ে যাওয়ার খবর প্রচার করা শুরু হয় -তখন বুঝতে হবে ভোটে জালিয়াতি করা হচ্ছে। সেটি বহু ১১ দলীয় জোটের প্রার্থির ক্ষেত্রে ঘটেছে। যেমন বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবরে তারেক রহমানের বিপরীতে ডা. খালেদুজ্জামান বিপুল ভোটে এগিয়ে দেখানো হয়, এগিয়ে দেখানো হয় মাওলানা মামুনুল হককে। কয়েকটি চ্যানেল মাওলানা মামুনুল হককে বিজয়ী দেখানো হয়। কিন্তু হঠাৎ করে পরিবর্তন লক্ষ করা গেল। গণনার খবর কয়েক ঘন্টা থামিয়ে তাদেরকে পরাজিত দেখানো হলো। রাত সাড়ে ১০টা অবধি ১১ জোট এবং বিএনপি সমানে সমানে এগুচ্ছিল। অনেক আসনে জামায়াত এগিয়েছিল। হঠাৎ করেই জামায়াতের অগ্রগতি থেকে গেল, শুরু হলো গণনায় বিএনপির দ্রুত এগিয়ে যাওয়া। বিএনপির দ্রুত বিজয় পেল। এমন ফলাফল একমাত্র ভোট জালিয়াতীতেই সম্ভব, সুষ্ঠ নির্বাচনে নয়।
চার). ভোটগণনা শেষ হওয়ার আগেই মিডিয়াতে বিজয়ী ঘোষণা
ভোটগণনা শেষ হওয়ার বহু আগেই মিডিয়াতে বহু বিএনপি প্রার্থীকে বিজয়ী রূপে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এমনটি সাধারতঃ করা হয় ভোট জালিয়াতীকে জায়েজ করার জন্য। পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকগণ তখন মনবল হারিয়ে ফেলে এবং ভোটকেন্দ্র পরিত্যাগ করে। খালি ভোটকেন্দ্রে তখন জাল ভোট মিশিয়ে দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। পত্রিকায় এমন রায়ের ঘোষণা নির্বাচনি কমিশনের পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ করা উচিত ছিল।
ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং কিছু প্রচলিত পদ্ধতি
এক). গণনা কালে জাল ভোটের মিশ্রণ
জাল ভোট দেয়ার জন্য বহু ব্যালট পেপারে আগে থেকেই সিল মেরে বিশেষ বাক্সে প্রস্তুত রাখা হয়। এ কাজটি সবগুলি ভোটকেন্দ্রে করা হয়না; করা হয় সেসব কেন্দ্রগুলিতে যেখানে সে কাজটি করা সহজ। বিশেষ করে যেসব ভোট কেন্দ্রে প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্টগণ শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে দুর্বল, অনভিক্ষ, অল্প শিক্ষিত -যাদের ধোকা দেয়া সহজ।
গণনার টেবিলে নতুন ভোট যোগ করা হয় রাতের এমন এক সময়ে যখন বিভিন্ন দলের পরিশ্রান্ত ও ক্ষুদার্ত পোলিং এজেন্টরা -বিশেষ করে ছোট দলের এজেন্টরা, নির্বাচন কেন্দ্র ত্যাগ করে চলে যায়। দেয়া হয় এভাবে ভোটকেন্দ্র খালি হয়ে যায় এবং দুয়েকজন যারা থেকে যায় তারাও ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখনই জাল ভোট মিশিয়ে। অনেক সময় বিপক্ষ দলীয় পোলিং এজেন্ট বলপূর্বক বের করে দিয়ে জাল ভোট আসল ভোটের সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। অনেক সময় ক্ষুদার্ত পোলিং এজেন্টদের আপ্যায়নের নামো গণনার স্থান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়; ঠিক সে মুহুর্তে জাল ভোটগুলি মিশিয়ে দেয়া হয়। অনেক সময় ভোট গণনা করা হয় পোলিং এজেন্টদের রুম থেকে বের করে দিয়ে।
দুই). কারচুপি হয় রিটার্নিং অফিসার তথা ডিসির অফিসে।
নির্বাচন শেষে প্রেসাইডিং অফিসার একটি ফরমে প্রার্থীদের পাওয়া ভোটের সংখ্যা উল্লেখ করে নিজে স্বাক্ষর করে পোলিং এজেন্টকে দেয়। এবং তার কপি রিটার্নি অফিসার তথা ডিসির কাছেও জমা দেয়। এ ফরমকে পাকিস্তানের পি- ৪৫ বলা হয়। কিন্তু রিটার্নিং অফিসারের অফিসে সে সংখ্যায় পরিবর্তন আনা হয়; যেমন ২০০ পাশে শূণ্য বসিয়ে ২০০০ বানানো হয় এবং এভাবে পছন্দের প্রার্থীকে বিজয়ী করে একটি ফরম জারি করা হয়। এ ফরমকে পাকিস্তানের পি-৪৭ বলা হয়। এই পি-৪৭য়ের উপর ভিত্তি করেই নির্বাচনি কমিশনের পক্ষ থেকে নির্বাচনের চুড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হয়। পাকিস্তানের গত নির্বাচনে ইমরান খানের দল তাহরিকে ইনসাফ ভুমিধ্বস বিজয় পায়। কিন্তু তাকে পি-৪৭’য়ের সাহায্যে পরাজিত দেখানো হয়।
তাই নির্বাচনে ডিসি’র থাকে চুড়ান্ত ক্ষমতা। তার প্রমাণ, পোলিং স্টেশনের হিসাবে বিজয়ী ঘোষিত প্রার্থীকে পরে ডিসি অফিস থেকে পরাজিত বলা হয়। এজন্যই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরোধী। কারণ তারা চায় নিজেদের ই্চছামত ডিসির নিয়োগ চায়। প্রফেসর ইউনুসের স্বরাষ্ট উপদেষ্টা বিএনপি ঘেঁষা। ফলে ডিসি নিয়োগে তিনি বিএনপির খায়েশ পূরণ করে থাকবেন -সেটিই স্বাভাবিক। মুজিব, এরশাদ ও হাসিনার আমলে সে কাজগুলি করতো তাদের হাতে নিয়োগপ্রাপ্ত ডিসিরা। ফলে তাদের আমলে নির্বাচনের নামে হতো নিছক সিট ভাগাভাগি, জনগণের রায় সেখানে গুরুত্ব পেত না।
তিন). ভুয়া নির্বাচন কেন্দ্র (ghost polling station)
ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয় কিছু ভুয়া নির্বাচন কেন্দ্রের (ghost polling station) নাম দিয়ে -যেগুলো আসলো কোন ভোট কেন্দ্র নয়। সেসব ভুয়া ভোট কেন্দ্রের ভোটগুলি যোগ করা হয় কাঙ্খিত প্রার্থীকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে।
এখন যা করণীয়
এ মুহুর্তে জরুরি হলো ১১ দলীয় জোটের একতা বজায় রাখা। যারা ১১ দলীয় জোটের বাইরে রয়েছে এবং পরাজিত হয়েছে তাদের সাথেও কোয়ালিশন গড়া। নির্বাচনের এ ফলাফল মেনে নিতে সম্মিলিত ভাবে অস্বীকৃতি জানাতে হবে এবং সন্দেহ জনক আসনে তদন্তের দাবী করতে হবে। যেসব আসনে ভোটের পার্থক্য ৫ বা ১০ হাজারের কম সেসব আসনে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু করা হোক। প্রতি আসনের সকল ভোটকেন্দ্রের প্রেসাইডিং অফিসারের স্বাক্ষরিত প্রাপ্ত ভোটের যোগফল মিলিয়ে দেখা হোক প্রকৃত বিজয়ী প্রার্থী কে? যেসব জেলায় বিএনপির ভুমিধ্বস বিজয় পেয়েছে সেসব জেলার ডিসিদের রাজনীতির ইতিহাস ও নৈতিক চরিত্র নিয়ে তদন্ত করা হোক। এ মুহুর্তে বিভিন্ন জায়গায় জোটভুক্ত দলগুলির সদস্যদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের উপর যে হামলা হচ্ছে সেগুলি রোধে প্রশাসনের কাছে দাবি জানানো হোক। প্রশাসন ব্যর্থ হলে সংসদে যোগদান স্থগিত রাখা হোক।
বুঝতে হবে বিএনপি ও আওয়ামী এখন একাকার। তাদের সাথে রয়েছে ভারত। ফ্যাসিবাদ আবার দ্বারপ্রান্তে। লড়াইয়ে ক্ষ্যান্ত দেয়ার অবকাশ নাই। মাথা উচুঁ করে বাঁচতে হলে লড়াই করেই বাঁচতে হবে। নইলে আবার গোলাম হতে হবে। ১৩/০২/২০২৬