বাংলাদেশে ইসলাম নিয়ে রমরমা ব্যবসা ও রাজনীতি
এবং চরম ব্যর্থতা ইসলামের পূর্ণ প্রাকটিসে ও রাষ্ট্রবিপ্লবে
ফিরোজ মাহবুব কামাল
www.drfirozmahboobkamal.com/blog/বাংলাদেশে-ইসলাম-নিয়ে-রম/
বাংলাদেশে ধর্ম নিয়ে যেমন রাজনীতি হচ্ছে, তেমনি রমরমা ব্যবসাও হচ্ছে। কিন্তু দারুন ব্যর্থতা ইসলামের পূর্ণ প্রাকটিসে ও রাষ্ট্র বিপ্লবে। আর সে ব্যর্থতার কারণে বাংলাদশে বিশ্বরেকর্ড গড়েছে দুর্বৃত্তিতে। ধর্ম নিয়ে যারা রাজনীতি করে তাদের লক্ষণগুলি সুস্পষ্ট। নির্বাচন এলে তারা মাথায় টুপি দেয়, হাতে তাসবিহ নেয়, পাঞ্জাবী পড়ে এবং দল-বল নিয়ে মন্দির- মসজিদে যায়। সাথে ফটো সাংবাদিকও নেয় ফটো তুলে সেগুলি প্রচারের জন্য। হাসিনাকে তো মাথায় পটি বেঁধে রাস্তায় জায়নামাজে বসতেও দেখা গেছে। ঢাকশ্বেরী মন্দিরে গিয়ে হাসিনা বলেছিল, দেবী এবার গজে চড়ে (হাতিতে চড়ে) এসেছে, ফলে ফসল ভাল হবে। এরা মসজিদ, মাদ্রাসা ও কবরস্থানেও অর্থ দান করে। কিন্তু যখনই শাসনতন্ত্রে সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও আদালতে তাঁর শরিয়া আইনের প্রতিষ্ঠা দেয়ার কথা উঠে -তখন তারা প্রবল বিরোধীতা করে। এসবই হলো ধর্মের নামে প্রতারণা ও রাজনীতি।
আবার যারা ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে তাদের অপরাধ কি কম? তারা ওয়াজ করে, মসজিদে নামাজ পড়িয়ে, দোয়া করে অর্থ আদায় করে। ওয়াজ করা এবাদত। এটি দ্বীনের দাওয়াত। পবিত্র কুরআনে এমন দাওয়াত দেয়ার হুকুম এসেছে -তাই এটি ফরজ। যে কোন ইবাদতে নিয়েত থাকতে মহান আল্লাহকে খুশি করার, কিন্তু নিয়েত যখন অর্থ নেওয়ার, তখন সেটা আর ইবাদত থাকে না। সেটা ব্যবসায় পরিণত হয়। বাংলাদেশে সে ব্যবসা বিশাল আকারে চলছে। শোন যায়, অনেকে ওয়াজ করে ৫০ হাজার বা তারও বেশী অর্থ নেন। প্রশ্ন হলো, নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ কি ওয়াজ করে কখনো অর্থ নিতেন? এটি কার সূন্নত? নবীজী (সা:) তো তায়েফে ওয়াজ করতে গিয়ে গালি ও পাথর খেয়েছেন। ফলে তাঁর ওয়াজে বরকত ছিল।
তেমনি মসজিদে নামাজের ইমামতি করা ইবাদত, এটি ইমামের জন্য মর্যাদার বিষয়ও। কিন্তু যখন নামাজ পড়িয়ে অর্থ নেয়া হয় তখন সেটি আর ইবাদত থাকে না, ব্যবসায় পরিণত হয়।
বাংলাদেশের মুসলমানদের নিদারুণ ব্যর্থতা হলো, একটি গ্রামে বা একটি মহল্লায় এমন একজন যোগ্য মানুষও তা তৈরি করতে পারিনি যে বিনা অর্থে তার স্থানীয় মসজিদে ইমামতি করবে। অথচ নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের আমলে তো সেটিই হয়েছে। উপার্জনের জন্য মানুষ ভিন্ন ভিন্ন পেশা বেছে নিবে -যেমনটি বেছে নিয়েছিলেন সাহাবায়ে কেরাম, কিন্তু কখনোই সে উপার্জনের কাজে ধর্ম বা ইবাদতকে নয়। ধর্মকে অর্থ লাভের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা এক ধরণের বদমায়েশী। বদমায়েশ শব্দটি ফার্সি শব্দ। বদ অর্থ খারাপ, আর মায়েশাত অর্থ জীবন ধারণের উপায় বা অর্থনীতি। বেঁচে থাকার পথটি যাদের খারাপ পথে, তাদেরকেই ফার্সি ও উর্দু ভাষায় বদমায়েশ বলা হয়।
মুসলিমদের জন্য ইসলাম নিয়ে ব্যবসা করা যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি নিষিদ্ধ হলো প্রতারণা ও রাজনীতি করা। তাকে ইসলামের পূর্ণ প্র্যাকটিস নিয়ে বাঁচতে হয় অর্থাৎ নিজ জীবনে ইসলামের বিধানকে পূর্ণ প্রতিষ্ঠা দিতে হয়। সে সাথে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা দিতে হয় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও। ইসলামের এমন পূর্ণাঙ্গ প্রাকটিস মুসলমানের উপর বাধ্যতামূলক তথা ফরজ। বুঝতে হবে, মহান রব ইসলামের বিধানগুলিকে কুর’আনের পৃষ্ঠায় বন্ধি থাকার জন্য নাযিল করেন নাই।
যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলিম রূপে দাবী করে কিন্তু ইসলামের বিধানকে প্রতিষ্ঠা দিতে রাজী নয় -বুঝতে হবে সে মুনাফিক। মুনাফিক তো তারাই যাদের কথার সাথে কাজের মিল নেই। এরা মুখে মুসলিম, কিন্তু কর্মে অমুসলিমের মতই ইসলাম বিরোধী। পবিত্র কুর’আনে মুনাফিকদের কাফিরদের চেয়েও নিকৃষ্ট বলা হয়েছে। তারা রাজনীতি, আইন আদালত, অর্থনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতির ইসলামের প্রতিষ্ঠা দিতে রাজি নয়। অথচ এরূপ ইসলাম বিরোধীতা তো কাফেরদের কাজ। এদের কারণেই নবীজী (সা:) যে ইসলামের প্রতিষ্ঠা দিয়ে গেছেন, সে ইসলাম বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে বেঁচে নাই।
রাষ্ট্রের বুকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা কখনোই কোন মুসলিমের হতে পারে না বরং কাঙ্খিত তো এটাই, প্রতিটি মুসলিম ইসলামের প্রতিষ্ঠা দেয়ার কাজে জিহাদে নামবে। রাজনীতিতে বহু দাবি থাকতে পারে। কিন্তু একজন মুসলিমের মূল দাবি হবে ইসলামকে অর্থাৎ আল্লাহ সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরীয়ত প্রতিষ্ঠা দেওয়ার দাবি। এরূপ দাবি উঠানো স্রেফ রাজনীতি নয়, বরং পবিত্র ইবাদত। এটি জিহাদ। তাই মুসলিমের রাজনীতি হবে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনীতি। নবীজী (সা:) ও সাহাবাদের সবচেয়ে বেশী কুর’বান পেশ করতে এই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজটি এতোই গুরুত্ব পাওয়ার কারণ, ইসলাম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। না পেলে পূর্ণ ইসলাম পালনের কাজটিও হয়না। তখন মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব, তাঁর শরিয়া আইন, কুর’আনী জ্ঞানদান, দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার এজেন্ডা স্রেফ কিতাবেই থেকে যায়।
তাই এটি অতি স্বাভাবিক, মুসলিম হওয়ার সাথে সাথে একজন ঈমানদারের দায়িত্ব হলো সে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও শরিয়ার প্রতিষ্ঠার সৈনিক হবে। সে ইসলামের পক্ষে বিপ্লব আনবে সমাজ ও সমগ্র রাষ্ট্র জুড়ে । নবীজী (সা:)’র সময় সাহাবাগণ তো সেটি করেছেন। তাদের ধর্ম কর্ম কখনোই শুধু নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা প্রত্যেকে ইসলামের প্রতিষ্ঠা নিয়ে যেমন লাগাতর বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক জিহাদ করেছেন তেমনি অর্থ ও রক্তের কুর’বানী দিতে সশস্ত্র জিহাদেও নেমেছেন।
বাংলাদেশে আজ ইসলামের জাগরণ দেখে ইসলামে শত্রু পক্ষ বলতে শুরু করেছে, বাংলাদেশে উগ্রপন্থীর উত্থান ঘটেছে। প্রশ্ন হলো, ইসলামের পূর্ণ পালন নিয়ে বাঁচার সে প্রবল তাড়না, সে কি উগ্রপন্থীর উত্থান? বাংলাদেশের নামে একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ইসলামের উত্থান হবে, ইসলামী বিপ্লব আসবে এবং ইসলামী রাষ্ট্র নির্মিত হবে -সেটিই তো স্বাভাবিক এবং অতি কাঙ্খিত। ইসলামের গৌরব যুগের মুসলিমগণ তো সে ভাবেই বেঁচেছেন। সে ভাবে না বাঁচাই তো ইসলামের সাথে গাদ্দারী। এবং যারা সে গাদ্দারী নিয়ে বাঁচে, তারা তো মুনাফিক। তারা তো জাহান্নামের যাত্রী।
যারা বাংলাদেশে ইসলামের উত্থান নিয়ে চিন্তিত, তাদের কাছে প্রশ্ন, বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে কি তবে ইসলামের বদলে হিন্দুত্ববাদ, কমিউনিজম, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র বা অন্য কোন মতাদর্শের উত্থান ঘটবে? সেটি তো মুসলিমের কাজ হতে পারে না, সেটি তো মুনাফিক ও কাফেরদের কাজ। ইসলামের শত্রু শক্তি তো সেটিই চায়। তারা চায়, বাংলাদেশের মুসলিমগণ শুধু নামেই মুসলিম থাকবে, কিন্তু রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তি, প্রশাসন, আইন-আদালত ও অর্থনীতিতে অমুসলিমদের মতই আচরণ করবে -যেমনটি এতো কাল হয়ে আসছে। এমন ইসলামশূণ্যতাকে তারা বলে সেক্যুলারিজম। এ নীতি যেমন আ্ওয়ামী লীগের, তেমনি বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির। কথা হলো, যার মধ্যে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে -সে কি ইসলামে অঙ্গীকারশূণ্য রাজনীতিকে মেনে নিতে পারে? মেনে নিলে মুসলিম থাকে?
ঈমানের অর্থই হলো ইসলামের পক্ষ নেয়া ও পূর্ণ ইসলাম পালনের তাড়না। ঈমানের এ জায়গায় কখনোই কোন আপোষ হতে পারেনা। বাংলাদেশের জনগণের এ বিষয়ে সজ্ঞানে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বুঝতে হবে এটি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। বাড়ি, গাড়ি, চাকুরি বাছাইয়ে ভূল করলে কেউ জাহান্নামে যাবে না। কিন্তু রাজনীতির অঙ্গণে ইসলামের পথ ভিন্ন অন্য পথ নিলে নিশ্চিত জাহান্নামে যেতে হবে। ভূল ট্রেনে উঠে দোয়াদরুদ যতই পড়া হোক তাতে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছা যাওয়া যায়না। তেমনি জাহান্নামের পথের যাত্রী হয়ে জান্নাতে যাওয়া যায় না। ২৫/১২/২০২৫