এই যিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিন “আল-আশরুল আওয়ায়িল মিন যিল হাজ্জাহ” অর্থাৎ যিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিন হিসেবে পরিচিত-হাদীসে এসেছে আল্লাহর পথে জিহাদ থেকেও এই দশ দিনের একনিষ্ট ইবাদত অধিকতর উত্তম-আর কুরআনে এসেছে আল্লাহ্র পথে জিহাদ থেকে হজ্জ অধিকতর উত্তম-সুতরাং এই দশ দিনে একনিষ্টভাবে ইবাদত করা হজ্জ থেকেও উত্তম-(অবশ্য যারা হজ্জের কাজের পাশাপাশি আরো অন্যান্য ভাল কাজ করবেন তারা এগিয়ে থাকতে পারেন-এখানে প্রতিদান/ সওয়াবের বিষয়টা বিবেচনা করা হয়েছে-হজ্জ্বে বিধানে আবশ্যকতার বিবেচনায় নয়)-তাই আমাদের আর্থিক সামর্থ নেই বলে হজ্জে যেতে পারবনা ভেবে চুপ করেই বসে থাকি-অথচ কুরআন এবং হাদীসের স্পষ্ঠ ভাষ্য অনুযায়ী এটা প্রতিয়মান হচ্ছে যে আমরা আমাদের ঘরে বসে একনিষ্টভাবে ইবাদতের মাত্রা (আল্লাহর এবং তার রাসুলের আনুগত্যের মাত্রা) বাড়িয়ে দিয়েই হজ্জের থেকে অধিক উত্তম পুরষ্কার আল্লাহ্ কাছে থেকে আমরা পেতে পারি-আর এমন বিশাল পুরষ্কার দিতে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন সদা প্রস্তুত-শুধু প্রয়োজন আমাদের প্রবল ইচ্ছা ও সংকল্প-
ইবন আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘এমন কোনো দিন নেই যার আমল যিলহজ মাসের এই দশ দিনের আমল থেকে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়-সাহাবায়ে কিরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদও নয়? রাসূলুল্লাহ বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদও নয়-তবে যে ব্যক্তি তার জান-মাল নিয়ে আল্লাহর পথে যুদ্ধে বের হল এবং এর কোনো কিছু নিয়েই ফেরত এলো না (তার কথা ভিন্ন)-’ [বুখারী : ৯৬৯; আবূ দাউদ : ২৪৪০; তিরমিযী : ৭৫৭, হাদিসটি সহীহ]
আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,‘এ দশ দিনে নেক আমল করার চেয়ে আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় ও মহান কোন আমল নেই-তাই তোমরা এ সময়ে তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবীর (আল্লাহু আকবার) ও তাহমীদ (আল-হামদুলিল্লাহ) বেশি বেশি করে পড়-’ [মুসনাদ আমহদ : ১৩২; বাইহাকী, শুআবুল ঈমান : ৩৪৭৪; মুসনাদ আবী আওয়ানা : ৩০২৪, হাদিসটি সহীহ].
আবূ কাতাদা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,‘আরাফার দিনের সাওম আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিগত ও আগত বছরের গুনাহের কাফফারা হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন-’ [মুসলিম : ১১৬৩, হাদিসটি সহীহ]।
এই দশ দিন শ্রেষ্ঠ কেন?
১. আল্লাহ তা‘আলা এর কসম করে দিনলোকে সম্মানিত করেছেন-{সূরা আল-ফাজর, আয়াত : ১-২}-
২ এসবই সেই দিন আল্লাহ যাতে জিকিরের প্রবর্তন করেছেন-
৩. রাসূলুল্লাহ দিনগুলোকে পৃথিবীর দিনগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ দিন বলে আখ্যায়িত করেছেন, [মুসনাদ বাযযার : ১১২৮; মুসনাদ আবী ই‘আলা : ২০৯০]
৪. এই দিনগুলোর মধ্যে রয়েছে আরাফার দিন ‘আরাফা দিবসই হজ’-[তিরমিযী : ৮৯৩; নাসায়ী : ৩০১৬]
৫. এতে রয়েছে কুরবানীর দিন ‘আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ দিন হলো কুরবানীর দিন অতপর স্থিরতার দিন’-(অর্থাৎ কুরবানীর পরবর্তী দিন-কারণ, যেদিন মানুষ কুরবানী ইত্যাদির দায়িত্ব পালন শেষ করে সুস্থির হয়-) [নাসায়ী : ১০৫১২; ইবন খুযাইমা, সহীহ : ২৮৬৬]
৬. এ দিনগুলোতে মৌলিক ইবাদতগুলোর সমাবেশ ঘটে-[ফাতহুল বারী : ২/৪৬০]
৭-রাসূল সাঃ বলেন, আরাফার দিনের রোযার মাধ্যমে আমি আশা করছি পূর্বাপর দুই বৎসরের গুনাহ মাফ হবে-(সহীহ মুসলিম)
৮-এই দশ দিনের প্রতি দিনের রোযা মর্যাদা এক বছরের রোযার মর্যাদার সমতুল্য এবং এর প্রতি রাতের ইবাদত (রমযানের) কদরের রাত্রির কিয়ামের সমতুল্য। [তিরমিযি, ইবনু মাজাহ, বায়হাকী]
প্রতিটি মুসলিমের উচিত ইবাদতের বিশেষ মৌসুমগুলোকে সুন্দর প্রস্তুতির মাধ্যমে স্বাগত জানানো-যিলহজ মাসকে আমরা স্বাগত জানাতে পারি নিচের কাজগুলো বেশি বেশি করার মাধ্যমে:
১. এই দশটি দিন কাজে লাগাতে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা :আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তাদেরকে আমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব-আর নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সাথেই আছেন-’ {সূরা আল-আ‘নকাবূত, আয়াত : ৬৯}
২. হজ ও উমরা সম্পাদন করা : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,‘এক উমরা থেকে আরেক উমরা এতদুভয়ের মাঝের গুনাহগুলোর কাফফারা এবং মাবরূর হজের প্রতিদান কেবলই জান্নাত-’[বুখারী : ১৭৭৩; মুসলিম : ৩৩৫৫]
৩. সিয়াম পালন করা : রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,‘আরাফার দিনের সাওম আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিগত ও আগত বছরের গুনাহের কাফফারা হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন-’ [মুসলিম : ১১৬৩]
৪. সালাত কায়েম করা-৫. দান-সাদাকা করা :
৬. তাকবীর, তাহমীদ ও তাসবীহ পড়া : মানে তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবীর (আল্লাহু আকবার) ও তাহমীদ (আল-হামদুলিল্লাহ) বেশি বেশি করে পড়-’[বাইহাকী, শুআবুল ঈমান : ৩৪৭৪; মুসনাদ আবী আওয়ানা : ৩০২৪]
তাকবীরের শব্দগুলো নিম্নরূপ : (আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ-)
[ইবন তাইমিয়াহ, মজমু‘ ফাতাওয়া : ২৪/২২০]
৭. পশু কুরবানী করা-৮. গুনাহ থেকে দূরত্ব অবলম্বন করা-৯. একনিষ্ঠ মনে তওবা-
অনায়াসে হয়ে যায় এমন নিষিদ্ধ কাজ সমূহের ব্যপারে অধিক সতর্ক থাকাঃ
১-গান ও মিউজিক শুনা-ইবনে মাসউদ রাঃ বলেন গান অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে-
২-নারী পূরুষের/ বন্ধু বান্ধবীর অবাধ মেলামেশা এবং পারস্পরিক অব্যাহত দৃষ্টি নিবদ্ধকরণ-
৩-অপচয় করা-
৪-নিষিদ্ধ মুভি দেখে ও গেইমস খেলে সময় নষ্ট করা-
নিয়মিত ভাল কাজগুলো বেশি বেশি করা
১-কুরআন তেলাওয়াত,
২-জিকির,
৩-দু‘আ,
৪-দান-সাদাকা,
৫-পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচার,
৬-আত্মীয়তার হক আদায়,
৭-মা-বাবার বন্ধু-বান্ধবীর প্রতি শ্রদ্ধা,
৮-সৎ কাজে উৎসাহিত/আদেশ ও অসৎ কাজে নিরোৎসাহিত/নিষেধ,
৯-সালামের প্রচার,
১০-অন্যকে খাওয়ানো,
১১-প্রতিবেশিদের প্রতি সদয় আচরণ,
১২-মেহমানকে সম্মান,
১৩-পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা,
১৪-অন্যকে কষ্ট না দেওয়া,
১৫-অপর ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ,
১৬-অসাক্ষাতে অন্য ভাইয়ের জন্য দু‘আ,
১৭-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরূদ পড়া,
১৮-পরিবার ও সন্তানদের জন্য অর্থ ব্যয়,
১৯-অধিনস্তদের প্রতি সদয়,
২০-ওয়াদা ও আমানত রক্ষা,
২১-হারাম জিনিস থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়া,
২২-সালাতগুলোর পরে আল্লাহর জিকির,
২৩-সুন্দরভাবে অযূ করা,
২৪-আযান ও ইকামতের মাঝখানে দু‘আ করা,
২৫-জুমাবারে সূরাতুল কাহফ পড়া,
২৬-মসজিদে গমন করা, সুন্নত সালাতগুলো যত্ন সহকারে আদায় করা,
২৭-ঈদগাহে গিয়ে ঈদুল আযহার সালাত আদায় করা,
২৮-হালাল উপার্জন ও ভক্ষণ,
২৯-মুসলিম ভাইদের আনন্দ দেওয়া,
৩০-দুর্বলদের প্রতি দয়াদ্র হওয়া,
৩১-কৃপণতা পরিহার করা,
৩২-ভালো কাজে পথ দেখানো,
৩৩-কল্যাণকাজে মানুষকে সহযোগিতা ইত্যাদি-এগুলো হচ্ছে একজন মুসলিমের বেসিক গুণ-কিন্তু আমাদের পরিচয় শুধু মুসলিম নয়, বরং আমরা অন্যকে আল্লাহর পথে রাখা ও আহবান করার দায়িত্ব দাবী ও অনুভব করি-তাই এই গুঙ্গুলো আমাদের অর্জন করা অত্যন্ত জরুরী-সুতরাং আসুন আমরা যিলহজ্জ মাসের এই ১০ দিনকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে সচেষ্ট হই-মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের কাছে ক্ষমা ও তার দয়া কামনা করছি-